April 23, 2018

গ্রাম বাংলার ঢেঁকি আজ রূপকথার গল্প

dace picমশাহিদ আহমদ : ঢেঁকির ধুম ধুম শব্দ এখন আর ছড়িয়ে পড়ে না চারদিকে। চোঁখে পড়ে না বিভিন্ন উৎসবে ঢেঁকিছাঁটা চালের ক্ষীর-পায়েস রান্না। আবহমান এ যুগের ছেলে-মেয়েদের ছবি দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে ঢেঁকি শিল্পকে। অথচ গ্রাম ছাড়া ঢেঁকি কিংবা ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনাও  করা কঠিন ছিল। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এক সময় চাল তৈরি, চিড়া ভাঙা, আটা, পায়েসের চালের গুঁড়ো, খির তৈরির চাল বানানোর যন্ত সেই ঢেঁকি আজ অসহায় হয়ে পড়েছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনের কাছে। এক সময় জনপ্রিয় গান ও প্রবাদ রচিত হয়েছিল বাংলার তরুণী-নববধূ ও কৃষাণীদের কণ্ঠে “ও বউ ধান ভাঙেরে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, আমি নাচি, বউয়ে নাচে হেলিয়া দুলিয়া, ও বউ ধান ভাঙেরে। “পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকির প্রাণ” , “আমড়া কাঠের ঢেঁকি”। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধানভানে।  ঘরে ঘরে ধানের নতুন চাল ভাঙা বা চাল গুঁড়া করা, আর সে চাল দিয়ে পিঠা, পুলি, তালের পিঠা, ফিরনি, পায়েস তৈরি করার ধুম পড়ে যেত। বাতাসে ভেসে বেড়াত পিঠার সুঘ্রাণ। এখন ঢেঁকির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে বিভিন্ন উৎসবও। যান্ত্রিক যুগের কলাকৌশলে ঢেঁকির অস্তিত্ব আজ বিলীন। সেজন্যে গ্রামে এখন ঢেঁকি দেখা যায় না। একদিন আসবে যখন ঢেঁকি দেখার জন্যে আমাদের নতুন প্রজন্মকে জাদুঘরে যেতে হবে। এই ঐতিহ্যবাহী  গ্রাম বাংলার ঢেঁকি নিয়ে বাউল শিল্পিরা গেয়েছেন অনেক অনেক গান। কবি-সাহিত্যিকরা লিখেছেন কবিতা-গল্প। সভ্যতার প্রয়োজনে এই ঢেঁকির  আবির্ভাব ঘটেছিল। আবার গতিময় সভ্যতার যাত্রাপথে আধুনিক প্রযুক্তিগত কারণেই  বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।  মহিলারা সংসারে শত অভাব-অনটনের ভেতরেও নিজেদের ক্লান্তি ঢাকার জন্যে ঢেঁকির তালে তালে গান গেয়ে ধান ছাঁটাইয়ের কাজ করতেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি চোঁখে পড়ত। প্রতিটি কৃষকের  বাড়িতে একাধিক ঢেঁকি থাকত। ঘরের পাশেই বাড়তি চাল দিয়ে তৈরি করা হতো ঢেঁকি রাখার ঘর। গ্রামের  মহিলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত কে কত বেশি ভোরে উঠে ধান ছাঁটাই করতে পারেন। কৃষক বধূর ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভেঙে যেত কৃষকের। ধুম ধুম শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোমর দুলিয়ে ঢেঁকিতে পা দিয়ে পাড় দিতো বাড়ীর মহিলারা। বাংলার গৃহবধূরা কোথায় যেন একটা সুখের সন্ধান খুঁজে পেতেন। সর্বোপরি বলতে গেলে ঢেঁকি আজ যেন রূপকথার গল্পের মত হয়ে গেছে। কালের প্রভাবে বিকল্প ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে রাইস (চালের কল) মিল। এখন ঢেঁকির  নাম শুনেছেন অনেকেই কিন্তু চোঁখে দেখেননি এমন লোকও  আছেন। সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাত দৈর্ঘ্য কাঠের তৈরি কুল, বাবলা, জামগাছ ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো ঢেঁকি । পৌনে ১হাত চওড়া ও মাথার দিকে এক অগ্রভাগে সরু। এর মাথায় এক হাত কাঠের ওচা বা দস্তার মাথায় লাগানো থাকে লোহার গুলা। গুলার মুখ যে নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে সে স্থানকে গড় বলে। এটি চালানোর জন্য সাধারণত ৩জন নারীর অংশ গ্রহন প্রয়োজন হয়। ২জনে খানিকটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে পা দিয়ে ঢেঁকিতে পাড় দেয়। অন্যজন মাটিতে বসে গুলার নীচে ধান বা চাল ওলোট পালট করে দেন। যাতে ধানের খোলস ভেঙে চাল বেরিয়ে আসে। ধান বানতে নুন্যতম ২জন লোকের প্রয়োজন হয়। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের মেধাবী ছাত্র রাহাত আহমদ শিপন জানান- ঢেঁকি আমাদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। এ শিল্পকে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প রক্ষায় নতুন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে।

সর্বশেষ সংবাদ