April 23, 2018

প্রাণ ফিরলো কুদালী ছড়ার

109753_x4স্টাফ রিপোর্টার : নামে কুদালী ছড়া। আর কাজের চাপ নদীর মতোই। কিন্তু তার কদর কিংবা যত্ন নেই বিন্দুমাত্র। ছোট্ট ছড়াটির উপর বড় ধকল। জন্ম থেকে না হলেও এখন যেন এমনটিই ছড়াটির নিয়তি। শুরু থেকে এখনো একাই সামাল দিতে হয় শহর ও গ্রাম। প্রতিনিয়ত এমন অযাচিত অত্যাচারের দৃশ্য চলমান। জানা গেল ছড়াটি বর্ষিজোড়া পাহাড় থেকে শুরু হয়ে শহর ও গ্রাম দিয়ে বয়ে হাইল হাওরেই শেষ। নাব্য হ্রাস আর দু’তীরে অবৈধ দখলদারিত্বে বিলীন হতে চলেছিল কুদালী ছড়া।  প্রতিনিয়তই এমন জন উপদ্রবে এক সময়ের স্রোতস্বিনী কুদালী ছড়াটি হয়ে পড়ে মৃত্যুপথযাত্রী। আর এ কারণেই বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় শহরবাসীর অসহনীয় দুর্ভোগ। ছড়াটির এমন আত্মহনন রোধে উদ্যোগী হন মৌলভীবাজারের পৌর মেয়র। পৌরসভার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় জেলা প্রশাসনও। তাদের যৌথ উদ্যোগে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কুদালী ছড়া রক্ষায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে হয় বৈঠক। জেলা প্রশাসকের হলরুমে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আসে ১০ই ফেব্রুয়ারি স্বেচ্ছাশ্রমে কুদালী ছড়া খননের। এমন সিদ্ধান্তে অনুপ্রাণিত হন স্থানীয় বাসিন্দারা। সকলেই কোদালী ছড়া বাঁচাতে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিতে আগ্রহী হন। ওইদিন পৌরসভার আওতাধীন প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশে কুদালী ছড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেন সহস্রাধিক মানুষ। জানা যায় কুদালী ছড়ার দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১৭ কিলোমিটার। পৌরসভা ছাড়াও ৩টি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম দিয়েও প্রবাহিত হচ্ছে ছড়াটি। সে কারণে ছড়াটি শহরবাসীর জন্য যে শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন এমনটি নয়। গ্রামের কৃষিজীবী মানুষেরও জীবনের অনুষঙ্গ। তাই ছড়াটি কৃষিজীবী মানুষের ধান ও মৌসুমী সবজি চাষের জন্য পানির অন্যতম উৎস। আর তার স্বচ্ছ মিঠা পানির জলাধার দেশীয় প্রজাতি মাছের নিরাপদ আবাসস্থল। গতকাল সরজমিন সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষিজীবী জুনেদ আহমদ, সিরাজুল ইসলাম, শওকত আহমদসহ অনেকেরই সঙ্গে আলাপে তারা জানালেন মৃতপ্রায় কুদালী ছড়া আমাদের কৃষি ক্ষেতের জন্য ছিল অভিশাপ। নাব্য হ্রাসে আর বেদখলে বর্ষাকালে দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। আর শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি। তাই দু’মৌসুমেই দু’তীরের ব্যাপক জমি থাকে অনাবাদি। আর আবাদ হলেও ভালো ফলন নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি কুদালী ছড়া খনন কাজ শুরু হওয়াতে আমরা আশান্বিত। ছড়াটির প্রাণ ফিরলে আমাদের মুখেও হাসি ফুটবে। তাদের প্রত্যাশা কুদালী ছড়া আগের মতোই হবে গ্রাম ও শহরবাসীর জন্য আশীর্বাদ। তবে সে জন্য ভরাট হওয়া কুদালী ছড়ার পুরো ১৭ কিলোমিটারই খননের জোর দাবি তাদের।  ছড়াটির উপকারভোগী অনেকেই জানান আগে একাধিক বার কুদালী ছড়া খননের নাম করে প্রকল্পের পুরো টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এবারই প্রথম পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে খনন কাজ শুরু করায় তারা আনন্দিত। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, কুদালী ছড়াকে আগের রূপে ফিরিয়ে নিতে বেশকিছু পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপটি তারা বেশ সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। প্রথম ধাপটি ছিল ছড়া রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা। ২য় ধাপ হচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও খননকাজ। ৩য় ধাপ হলো ছড়ার দু’পাশ চিহ্নিত করে তা রক্ষায় সংরক্ষণ প্রাচীর (গাইড ওয়াল) নির্মাণ করা। ৪র্থ ধাপে রয়েছে ছড়ার পাশ দিয়ে মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে নিরাপদ পায়ে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) তৈরি করা। তাছাড়া স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি ছড়াটির দু’তীরের মানুষকে অনাবাদি কৃষিজমি চাষাবাদ, খাঁচায় মাছ চাষ ও হাঁস পালনের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করে দেয়া। ছড়াটির দু’পাশ রক্ষায় সংরক্ষণ প্রাচীর তৈরির আগে পৌরসভা, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে জরিপ কাজ পরিচালিত হবে। ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি দল ওই জরিপ কাজ পরিচালনা করবে। পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন খান বলেন, আমরা সম্মানিত পৌর নাগরিকদের সহায়তায় পরিষ্কার পরিছন্নতা শেষে এ পর্যন্ত পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে ২টি এক্সেবেটরসহ আরো ৩-৪টি গাড়ি দিয়ে পৌরসভার আওতায় প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার খননের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছি। এই কাজ শেষ হলে অন্যান্য ধাপের কাজ শুরু হবে। তবে অন্যান্য কাজের ব্যয় সংকুলান পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে করা প্রায় দুষ্কর। সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানিয়ে মেয়র মহোদয় যোগাযোগ করছেন। তাদের সাড়া পেলে শিগগিরই অবশিষ্ট অসম্পন্ন কাজগুলো শুরু হবে।

মৌলভীবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডা. এমএ আহাদ বলেন, কুদালী ছড়া হচ্ছে  মৌলভীবাজার শহরের প্রাণ। পুরো শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। নানা কারণে ছড়াটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল। পৌর মেয়র ছড়াটি বাঁচাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসার দাবিদার। ছড়াটির দু’পাড় রক্ষা করে তাতে দৃষ্টিনন্দন গাছ লাগানোরও পরামর্শ তার।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন, কুদালী ছড়ার স্বচ্ছ পানিতে একসময় শহর ও গ্রামের সৌখিন মৎস্য শিকারীরা বড়শি কিংবা জাল দিয়ে মাছ ধরতেন। ছোট ঘাসি কিংবা ডিঙ্গি নৌকায়ও লোকজন চলাচল করতেন। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে কৈ, মাগুর, শিং আর বোয়াল মাছের উজাই ধরতেন স্থানীয়রা। এখন সে স্মৃতির বাস্তবতা নেই এই প্রজন্মের কাছে। এর অন্যতম কারণ দীর্ঘ সংস্কারহীনতায় ছড়াটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। শহর সৌন্দর্য রক্ষায় ছড়াটির গুরুত্ব অপরিসীম। পৌরসভার এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে শহরবাসী কৃতজ্ঞচিত্রে স্বাগত জানাচ্ছেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী বলেন, শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ছড়াটি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। তাই ছড়াটিকে বাঁচিয়ে শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের যে সময় উপযোগী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেজন্য পৌরসভার মেয়রকে নাগরিকদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমদ বলেন, কুদালী ছড়া আর অভিশাপ নয়। এখন আশীর্বাদ। শহরবাসীসহ ছড়াটির দু’তীরের বাসিন্দাদের মুখে হাসি ফুটেছে। একটি উদ্যোগে যে সমাজ উপকারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ হলো পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে কুদালী ছড়ার খনন কাজ।

বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী আরিফুল হক বলেন, বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গেল বছর সাড়ে ৫  কিলোমিটার ও চলতি বছর ২ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে। আরো ২ কিলোমিটার খনন কাজ শিগগিরই শুরু হবে। এই দু’কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হলে ছড়াটি প্রাণ ফিরে পাবে।

পৌর মেয়র ফজলুর রহমান বলেন, নাব্য হ্রাসে ছড়াটির অস্তিত্ব ছিল বিলীন হওয়ার পথে। শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত একমাত্র ছড়াটির দু’পাশের অধিকাংশই দখল ও ভরাট  হওয়ার কারণে একসময়ের স্বচ্ছ ও স্রোতস্বিনী ছড়াটির নেই সেই ঐতিহ্য। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই শহরে বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লাতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ছড়াটির এই দুর্দশা হতে মুক্ত করতে আমাদের এই প্রয়াস। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও সৌন্দর্য বর্ধনে এই ছড়াটি নিয়ে আমরা নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সম্মানিত নাগরিকদেরও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা পাচ্ছি। অনেকেই বাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে জায়গা ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর সচেতনতায় কুদালী ছড়া তার হারানো সোনালী অতীত ফিরে পাবে।

জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বলেন,  পৌরসভা এলাকা ছাড়া বিএডিসি কুদালী ছড়ার বাকি অংশটুকুর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। খনন কাজ শেষ হলে দু’তীর রক্ষা করে তাতে গাছ লাগানো হবে এবং পায়ে হাঁটার পথ তৈরি করা হবে।

সর্বশেষ সংবাদ