January 20, 2018

চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রিতে কিছু সময়

IMG_20171123_140549মাহফুজ শাকিল : গেলো বছরের ২২ নভেম্বর পারিবারিক একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ঢাকায় যাওয়া। সাথে বরাবরের মতো অগ্রজ সাংবাদিক এম. মছব্বির আলী ভাই। ঢাকায় দুই দিনে পারিবারিক কাজ শেষ করে যখন নীড়ে ফেরার পালা তখন বাধা হয়ে দাড়ালেন দাবাড়– মোস্তফা কামাল হীরা ভাই। জানালেন টেলিভিশনে একটি রিপোর্ট করতে আমাদের যেতে হবে রোহিঙ্গা শিবিরে। এত দূরের জার্নিতে যেতে মছব্বির ভাই কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না। হীরা ভাইও নাছোড়বান্দা। তিনি আমাদের নিয়ে যাবেনই। বিমানের টিকেট কেটে এনে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন প্রবাসীর আমন্ত্রণে চট্টগ্রামে যেতে হবে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে সংবাদ টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য সংবাদ সংগ্রহ করতে। কি আর করা। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। ২৪ নভেম্বর শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ৭টার সময় বাংলাদেশ বিমানের শেষ ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করি। আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ শেষে পুণরায় চট্রগ্রামে ফিরে আসি। পরদিন দুপুরে মছব্বির ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন চট্টগ্রামের সেই বিখ্যাত ওয়ার সিমেট্রি দেখাতে। জানালেন তিনি এই নিয়ে তৃতীয়বার এখানে এসেছেন। এখানে আসলে নাকি তিনি মনে প্রশান্তি লাভ করেন। বেলা ২টা ২০মিনিটে সেখানে গিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হলো। কারণ প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্যে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত,থাকে। কি আর করা, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বেলা ৩টায় প্রবেশদ্বারের গেটের দরজা খুলে যাওয়ার পর আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করা মাত্রই একটা অনুভূতি আমার মনে শিহরণ দিয়ে উঠলো। স্বচক্ষে সারিবদ্ধ অনেকগুলো কবর দেখলাম, নিজের হৃদয়ে একটা টনক নড়া দিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত সেই শহীদদের কথা মনে পড়ে গেল। তারা এইখানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি : কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি চট্টগ্রাম (Commonwealth War Cemetery Chittagong) কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশনের একটি সৌধ যেটি সাধারনভাবে চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি নামে পরিচিত। সবুজ পাতাবাহারের বেষ্টনী ঘেরা কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি। কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি চট্টগ্রামের মেহেদীবাগ দামপাড়া এলাকায় ১৯ নং বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়কে অবস্থিত। এটি মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, চট্টেশ্বরী সড়কের চারুকলা ইনস্টিটিউটের কাছাকাছি এবং ফিনলে গেস্ট হাউসের নিকটবর্তী পাহাড়ি ঢালু আর সমতল ভূমিতে গড়ে উঠেছে। এটি শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ২২ কিঃমিঃ উত্তরে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৮ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। সমাধি এলাকা সবুজ বৃক্ষ আর পাতাবাহারের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। ওয়ার সিমেট্রির প্রতিষ্ঠাকালে এলাকাটি বিশাল ধানক্ষেত ছিলো, যদিও বর্তমানে এটি বেশ উন্নত এলাকা এবং শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিগনিত। পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে নির্মিত এ সিমেট্রির বাইরের অংশে খোলা মাঠ রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্যে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত, তবে শীতকালীন মৌসুমে এ সময়সূচির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে থাকে। কোলাহল মুক্ত এই সমাধি এলাকায় দর্শনার্থীদের উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার থাকলেও এখানে বসা নিষেধ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এযাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল, এই ছয় বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সীমা ধরা হলেও ১৯৩৯ সালের আগে এশিয়ায় সংগঠিত কয়েকটি সংঘর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মহাসমরকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত যুদ্ধ বলে ধরা হয় যাতে ৩০টি দেশের সব মিলিয়ে ১০ কোটিরও বেশি সামরিক সদস্য অংশগ্রহণ করে। এছাড়া বেসামরিক জনগণের উপর চালানো নির্বিচার গণহত্যা, হলোকস্ট (হিটলার কর্তৃক ইহুদীদের উপর চালানো গণহত্যা), পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ প্রভৃতি ঘটনায় কুখ্যাত এই যুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি থেকে সাড়ে ৮ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এসব পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নিহত কয়েক শতাধিক বিদেশী শহীদদের সমাধি দেয়া হয় চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবতী সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এই সমাধি সৌধ প্রতিষ্ঠা করে। সূচনালগ্নে এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রায় ৪০০টি সমাধি ছিলো। তবে বর্তমানে এখানে ৭৩১টি সমাধি বিদ্যমান যার ১৭টি অজানা ব্যক্তির। এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাতীয় বিদেশী সৈন্যদের প্রায় ২০টি (১ জন ওলন্দাজ এবং ১৯ জন জাপানি) সমাধি বিদ্যমান। এছাড়াও এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) চট্টগ্রাম-বোম্বের একটি স্মারক বিদ্যামান। যুদ্ধ চলাকালীন সময় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং ১৫২ নং ব্রিটিশ জেনারেল হাসপাতালের সুবিধার কারণে চট্টগ্রামে মিত্র বাহিনী চতুর্দশ সেনাবাহিনীর এই পথিকৃৎ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। হাসপাতালটি ডিসেম্বর ১৯৪৪ থেকে অক্টোবর ১৯৪৫ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলো। প্রাথমিকভাবে এই সমাধিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪০০ মৃতদেহ সমাহিত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও যুদ্ধ শেষে অতিরিক্ত মৃতদেহ লুসাই, ঢাকা, খুলনা, যশোর, কক্সবাজার, ধোয়া পালং, দোহাজারি, রাঙ্গামাটি, পটিয়া এবং অন্যান্য অস্থায়ী সমাধিস্থান থেকে এই সমাধিস্থানে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কবরের সংখ্যা মোট ৭৫৫। পেশা অনুসারে পেশা সংখ্যা সৈনিক ৫২৪, বৈমানিক ১৯৪, নাবিক ১৩। স্থান অনুসারে দেশ সংখ্যা-যুক্তরাজ্য ৩৭৮, কানাডা ২৫, অস্ট্রেলিয়া ৯, নিউজিল্যান্ড ২, মায়ানমার ২, নেদারল্যান্ডস ১, জাপান ১৯, অবিভক্ত ভারত ২১৪, পূর্ব আফ্রিকা ১১, পশ্চিম আফ্রিকা ৯০ ও অন্যান্য ৪।
লেখক : মাহফুজ শাকিল- সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সংগঠক।

সর্বশেষ সংবাদ