January 20, 2018

এক হেমন্তের ভোরে

Selina chowdhuryসেলিনা চৌধুরী : “নিবিড় রাত্রির শান্ত আকাশ হও গল্প রসের স্নিগ্ধতায় হিম অরণ্য হও। পৃথিবীর যাবতীয় বৈশাখী মেঘের নিমগ্ন প্রার্থনায় সুন্দর হও প্রকৃতির মতো”। হে আমার সৃষ্টিকর্তা বুদ্ধি দাও, শক্তি দাও, অনুভূতি দাও, কল্পনা দাও, জীবনকে মহিমান্বিত করো, প্রাণময় করো, নিষ্ঠাময় করো। ব্যস্ততার কারনে আগের মতো নিয়মিত লিখতে পারিনা তবুও আবার একটু চেষ্টা করছি মাত্র। হেমন্তের শেষ শীতের মৃদু হাওয়া বইছে সমস্ত প্রকৃতিতে। গাছের ছায়ারা লম্বা হয়ে আসর জমিয়েছে, আসর জমিয়েছে শ্যামল চত্বরে। হলদে প্রজাপতিরা পাখা ঝাপটে ঝোঁপের মাথায় উড়ে বেড়াচ্ছে। শীত শরৎ এর বিক্ষিপ্ত গন্ধ, বিচিত্র সবুজের কোলে জীবন প্রকৃতির কোলাহল, দুর্বা গালিচার ঢিবির উপরে দাড়িয়ে আছে স্থবির নোনা গাছ। মাথার উপরে হলদে ফুলে ভরা বিচ্ছুটি লতাঝরে পড়েছে সাই বাবলার শুকনো পাতা। ভাবনার জাল পেরিয়ে বাস্তবে ফিরে এলাম। আজ মনে হলো এ দেশের নারীদের নিয়ে কিছু কথা লিখি আমাদের মেয়েদের এগিয়ে যেতে হবে। এটা মনে যেনো না হয় যেটা সুকান্ত বলেছিলেন যে “অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভূমি”। জীবনে চলার পথে সইতে হয় কাটার আঘাত, জীবন মানে বেগ, জীবন মানে আবেগ, জীবন মানে লড়াই, জীবন মানে যন্ত্রণা, সুখ-দুঃখ আনন্দ বেদনা হাজারো বিপরীতের সমন্বয়ই জীবন, বাস্তব জীবন বড় কঠিন, বড় নিষ্ঠুর। তাই নিজেদের দুর্বল ভাবলে চলবে কেনো? মেয়েদের ও প্রাণশক্তি আছে। তারাও আঘাতকে প্রতিহত করার মনোবল রাখে। সুবিশাল এই পৃথিবী, এখানে আমরা কেউ সুখী, কেউ দুঃখী, ভালো মন্দ আলো আঁধারের ওলট পালটতো আছেই। মানুষ আমি ও ভীষণ বাস্তববাদী। নিজের কর্ম দ্বারাই মানুষের জীবন পরিচালিত হয়। অদৃষ্টবাদ বা ভাববাদে আমি বিশ্বাসী নই তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যেনো নিয়তী নামের ঐ অনাকাঙ্খিত জিনিসটার হাতের পুতুল। নারী যদি দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে সঠিক অবস্থানে যেতে না পারে সেই নির্বুদ্ধিতার দায়ভার ও বহন করতে হবে নারীকেই। এ সমাজে সেটাই নিয়ম। কিন্তু এই সমাজে অনেক সংগ্রাম করে সত্যিকারের বহ্নিশিখার মতো শিক্ষায় ও উন্নয়নে অবদান রেখেছেন এবং রাখছেন বহু নারী। সে সমস্ত নারীদের আমি সাধুবাদ জানাই। বিদ্যানন্দ দাস গুপ্তকে সমর্থন করে আমি বলছি সমাজ বিবর্তন ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি যেখানে নারী স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে প্রযুক্তি তথা শ্রম শিল্পে নারী ও পুরুষ উভয়ের মেধাই কাজ করছে। এখানে সমস্ত নীতি বিচারকে নতুনভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যত অবস্থার কষ্টি পাথরে যাচাই করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র সনাতনী রীতির দোহাই দিয়ে পিতৃতান্ত্রিকতা যা পুরুষের দাপটে অক্ষুন্ন রাখার উপায় নেই। নারী তন্ত্র ও পুরুষ তন্ত্র নিয়ে কোন সংঘাত বিষয়ক বিতর্ক আমার আলোচনার বিষয় বস্তু নয়। অবান্তর এবং অলীক বা যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই এমন কোন কথা আমার কলমে তুলে আনবোনা। আমি জানি একজন পুরুষের জন্ম যেভাবে একজন নারীর ও জন্ম সেভাবে। জীবন ও সভ্যতার এমন নিয়মতো হতে পারেনা । যে নারী ও পুরুষ দুই মেরুর বাসিন্দা। বিবেকানন্দ নারী ও নারী স্বাধীনতার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তাতে কি তার সে স্বপ্ন সফল হয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে যা দেখছি। আমি দেখেছি পৃথিবীর অনেক প্রাচীন ধর্মে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। আল্লাহ তায়ালা আগে সৃষ্টি করেছেন পুুরুষদের পরে নারীদের। যখন নারীদের সৃষ্টি করেছেন তখন নিশ্চয় প্রথমবারের ভুলগুলো শোধরাবার চেষ্টা করেছেন। এই কথাটা শুনে সমস্ত পুরুষেরা এতক্ষণে আমাকে পাগল ভেবে বসেছেন। হ্যাঁ ভাবতেই পারেন-চিন্তা-ভাবনা ব্যাপারটা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত এই বিষয়ে আলোচনা একটা জটিল বিষয়। ক্ষমা করবেন প্রিয় পাঠক। এই বক্তব্যের বিশ্লেষণ আরেকদিন করবো। বর্তমানে আমরা যে অবস্থানে আছি বুদ্ধি, বিচার, প্রতিভা বা মেধা কর্ম ক্ষমতা যেটাই বলিনা কেনো কোন দিক দিয়েই নারী পুুরুষের চেয়ে কম নয়। কিন্তু ইতিহাস এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, নারী কখনো পুরুষের সমান অধিকার পায়নি সংসারে, সমাজে ও দেশে। ঘরের চারকোনে বন্দী থেকে দুবেলা পেট ভরে খাওয়াইতো জীবন নয়। জীবন পৃথিবীকে জানার জন্য, পৃথিবীকে চেনার জন্য। আমাদের সমাজে লোক ধর্মের কাছে সত্য ধর্মকে বিসর্জন দেবার বহু চমৎকার প্রবণতা আমি দেখেছি যতটা কষ্ট পাই তার চেয়েও বেশি অবাক হই হায়রে ভালোবাসার শৃঙ্খলে বন্দী নারী। এই ভালোবাসার আসল রুপটা আমি বুঝতে পারিনা। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পের একটি উক্তির কথা মনে পড়ে গেলো। উক্তিটা ছিলো এরকম যে, “আমি যাহা বুঝিনা তাহা শিখাইতে গেলে কেবল কপঠতাই শিখানো হইবে আামার ব্যাপারটা ও হচ্ছে সেরকম। “নেই সেই পূর্ণিমা রাত ছায়া ছায়া এই আঁধারে যে ঘুম ঘুম বাতাসে সেই….. কথাগুলো আমি কখন, কোথায় শুনেছিলাম কিছুতেই মনে করতে পারছিনা কথাগুলো কি কোন কবিতার না গানের? কিন্তু ঘুরে ফিরেই কথাগুলো মনে পড়ছে। আজকের পৃথিবীতে নারীরা উচ্চশিক্ষা লাভ করছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় উন্নয়নে নারীদের অবদানের কথা কোন সুস্থ-সচেতন মানুষই অস্বীকার করতে পারেননা। উচ্চশিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন একটি অবিচ্ছিন্ন বিষয়। পথের সামনে আবর্জনা থাকলে হোঁচট কেনা খায়? তাই বলতে হচ্ছে সমাজে মধ্যযুগীয় চিন্তা ধারায় অবসান না ঘটার কারণে নারীর জয়যাত্রা স্থবিরতার সম্মুখীন। দেখা যাচ্ছে মেয়েরা অনেক ভালো কাজ করছে। হতাশাজনক হলেও সত্যি অনেক কষ্ট আর ধৈর্য্যরে বিনিময়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কর্মক্ষেত্রে নারীকে সংরক্ষিত আসনে লড়তে হয়। সেনা, নৌ, তথা প্রশাসনের বিশেষ কোন দায়িত্বশীল পদে নারীদের স্থান অনেকেরই মানতে কষ্ট হয়। প্রগতির সর্ব বিস্তারের লগ্নে এটা নারীদের প্রতি এক ধরণের অবহেলা ও উপহাসই বটে। দেশের উন্নয়ন কাজে নারী সমাজ অংশগ্রহণ করলে কেবল নারীরাই উপকৃত হবেনা, উপকৃত হবে গোটা দেশ। মেয়েদের এগিয়ে যেতে হবে গৌরবের সাথে, মাথা উঁচু করে। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় রাষ্ট্রচালনা, প্রশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা কোন ক্ষেত্রেই নারীর ভূমিকা মূল্যহীন নয়। কিন্তু সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সনাতনী রীতি হ্রাস পেলেও এদেশে এখনও নারীদের প্রতি সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেনি। যাতায়াত সমস্যা, আবাসিক সঙ্কট, উপযুক্ত পরিবেশের অভাব এবং রণীলতার নামে অহেতুক উন্নাসিকতা দারিদ্র্য ইত্যাদি বহু কারণে নারীদের অগ্রগতি বিঘিœত হচ্ছে। নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত “সমান্তরাল” নামক বইটির একটা ফিচারে উল্লেখিত কোটেশন তুলে ধরে বলা হয় “প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সবকিছুর এগিয়ে যাবার কথা, কিন্তু মানুষের হাত যেখানে পড়েছে সেখানে এই নিয়মের বিপরীতটাই ঘটেছে। তাই আদিম মাতৃতান্ত্রিক, শ্রেণীহীন, সাম্যবাদী সমাজের স্থান নিয়েছে আজকের পুরুষশাসিত শ্রেনীবিভক্ত, পুঁজিবাদী ও স্বৈরাচারী সমাজ। শিক্ষা মানুষের মনে অন্ধকার দূর করে বলে জেনেছিলাম কিন্তু নারী শোষনের বেলায় গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষিত, অশিক্ষিতদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। শহরের শিক্ষিত সমাজে ও নারী নিগ্রহ চলে শুধুমাত্র ধরণটা একটু ভিন্ন বরং এখনো অনেক আদিবাসী বা উপজাতীয় সমাজ আছে যারা নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত রেখেছে। তাই অহরহ এ কথা মনে হয় যা রাহুল সংকৃত্যায়নের পঞ্চাশ বছর আগের লেখারই পুনরাবৃত্তি- এই সমাজের জন্য কি আমাদের হৃদয়ে কোন শ্রদ্ধা, সহানুভূতি থাকতে পারে?” ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পরিবারের আপত্তি স্বত্বেও তিনি সেবিকা বিদ্যা শিখলেন অসুস্থ মানুষের যন্ত্রণা তার কোমল হৃদয়কে ব্যতিত করতো। ১৮৫৪ ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈনিকদের দু’বছর ধরে সেবা করে ফিরে আসলেন লন্ডনে। সমগ্র ইংল্যান্ড তখন জয়গানে মুখর। সমাজের সামনে তিনি একটা মানব সেবার আদর্শ স্থাপন করলেন। তাকে “অর্ডার অব মেরিট” উপাধিতে ভূষিত করা তিনিই প্রথম নারী, যিনি এই সর্বোচ্চ সম্মান ইংল্যান্ডে লাভ করেন। জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের নারীরা এগিয়ে যাক, দূর করুক নারীদের প্রতি সকল প্রীতিহীন আচরণ, ন্যায়হীন ধর্ম। লাভ করুক উচ্চ শিক্ষা, কাজ করুক নিজস্ব মেধা ও মননশীলতা নিয়ে। হে প্রভু এ দেশের নারীদের আরো জ্ঞান দাও, কল্যাণের পথ দেখাও। গড়ে উঠুক মানুষে মানুষে সু-সম্পর্ক। এক সুস্থ ও সংহতিপূর্ণ সুন্দর সমাজ। কবিতার ভাষায় বলতে হয় “সুন্দর হে সুন্দর দাও সুন্দর জীবন, দূর হউক সকল অকল্যাণ-অশোভন।

লেখক : সেলিনা চৌধুরী – সাংবাদিক, কলাম লেখক, সমাজসেবিকা।

সর্বশেষ সংবাদ