January 23, 2018

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন

fawzi chodhuryএ,এফ,এম ফৌজি চৌধুরী : ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায় প্রতিটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু দিনের অস্তিত্ব আছে যা গৌরবের ও অহংকারের। আমাদের সবচেয়ে গৌরবের ও শ্রেষ্ঠ অর্জনের দিন ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা  দিবস। এই দিনে বাঙালী জাতি পাকিস্তানী শাসনের চব্বিশ বছরের পরাধীন-দাসত্বের শৃংখল ভেঙ্গে অর্জন করেছে স্বাধীনতা, সংগ্রামের চরম বিজয়। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে ১৬ই ডিসেম্বরে। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণ উপনীত হওয়ার প্রশ্নটা ছিল দেশের মুক্তির, স্বাধীনতার। মানুষের জীবনে এর চেয়ে মৌলিক প্রশ্ন আর হতে পারেনা। মুক্তিযুদ্ধ একটা বিষয়ে আমাদের প্রত্যয়ী করে তুলেছিল, তা হল ঐক্যবদ্ধ মানুষকে পরাস্ত করা যায় না। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা সে সময় সাধারণ অস্ত্র হাতে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। জাতীয় মুক্তি এবং আত্মবিকাশের সে প্রথম স্বপ্ন ও অভিলাষ আমাদের একাত্তরের মোহনায় এনে মিলিত করেছিল। তাই আমাদের কাছে একাত্তর এত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৭ সালে আমরা একটি অসমাপ্ত স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। বর্তমান বাংলাদেশ সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসাবে গণ্য হয়। মানুষ আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বা বাঙালিদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, চাকুরী, সর্বত্রই চরম বৈষম্যের শিকার হয় পূর্ববাংলার জনগণ। প্রথম আঘাত আসে বাংলা ভাষার ওপর । ওরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চায়। আমরা বলি-না। শুরু হয় আন্দোলন, সংগ্রাম। ভাষা-আন্দোলন আমাদের জীবনের মর্মমূলে এমন আঘাত হানে যে আমরা অন্য মানুষ হয়ে যাই। আমরা প্রতিবাদী আর সাহসী হতে শিখি। এ আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রহন সমাজের স্থির চিত্রটাকে চঞ্চল করে দেয়। দেশ, ভাষা আর নিজের অস্তিত্ব একাকার হয়ে যায়। সে-আন্দোলন কখনো থামে না, তা বাসা বাঁধে আমাদের চৈতন্যের গভীরে।
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ৬ দফা। এই ৬ দফা কর্মসূচি ছিল বাংলার কৃষক, মজুর, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ। ছয় দফা আসলে বাঙালি অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকদের মধ্যকার সমন্বয়ের ফসল। পাকিস্তান সরকার আবার কঠোর দমননীতির আশ্রয় নেয়। ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলনের নেতৃত্বে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তরুণ ছাত্রনেতা আসাদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। জনতার তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উনসত্তরের প্রবল গণ-আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। কিন্তু ক্ষমতা দেওয়া হয়না। শুরু হয় ষড়যন্ত্র। সেই সন্ধিক্ষণে একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের এক সমাবেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। বাঙালিরা যা বোঝার বুঝে নিল। হঠাৎ পার্লামেন্ট অধিবেশন বন্ধ ঘোষনা করা হলো।
২৫ মার্চ কালো রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর লেলিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনিকে। তারা নির্বিচারে গুলি চালায় নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালীর উপর। গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তেমন কোনো প্রস্তুতি ছাড়া পুলিশ, ইপিআর ও বাঙালি সৈনিকরা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি প্রস্তুত করেন। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় অস্থায়ী প্রবাসী সরকার। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন কর্নেল (অব.) আতাউল গনি ওসমানী। বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ ও সমরাস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় ১ কোটি  বাঙালি ভারতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। একটা পর্যায়ে ভারত সামরিক সমর্থন প্রদান করেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ তাদের মিত্র দেশগুলো মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বাঙালি জাতির সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল। আবার বাঙালিরা সমর্থন পেয়েছিল সারা বিশ্বের নির্যাতিত, মুক্তিপাগল, প্রগতিশীলদের কাছ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। খোদ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হয় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামে বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধের অর্থ সহায়তা প্রদানের অনুষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন বাঙালি বরেণ্য ব্যক্তিরা সারা বিশ্ব থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজে নেমেছিল।
বিশ্বের অনেক বিবেকবান মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন প্রদান করলো। সম্মিলিত মানুষের সমর্থন বৃথা যায় না। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা লাঠি আর অস্ত্র দিয়ে আধুনিক পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে সমান তালে লড়াই চালিয়ে গেল। পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না, যুদ্ধেও ব্যাপক অভিজ্ঞতাও ছিল না বাঙালিদের। তারপরও তারা জয় পেল মাত্র নয় মাসে, তবে প্রাণ গেল অনেক। একটি নয়, শতও নয়, হাজারও নয়, ৩০ ল প্রাণ ঝরলো। ২ লক্ষ মা বোন সম্ভ্রম হারালো। বিজয় দিবসের মাত্র দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনে হত্যা করে দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীদের। বধ্যভূমিময় বাংলাদেশের মাটিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অস্থিমজ্জা-হাড় ত্রিশ লাখ শহিদের দেহাবশেষের সঙ্গে মিশে আছে। এই দেশের আকাশ তাদেরই শেষ নিঃশ্বাসের বেদনায় নীল। এই বাংলার উদিত সূর্যে তাদেরই রক্তের নীলিমা। নদীতে নদীতে তাদেরই অশ্র“র সারৎসার। এই বাংলাদেশ চিরকাল সেই ঘাতকদের অভিশাপ দেবে। এখনো রক্তাক্ত ক্ষতের মতো জাগ্রত একাত্তর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আসলেই শেষ হয়নি। সেই যুদ্ধকে অব্যাহত না রাখলে আমরা সামনের দিকে এগুতে পারব না। কেবল পেছনের দিকে হাঁটতে থাকবো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শুধু ঘরের চৌকাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। একে অন্তরে নিতে হবে, অন্তরে গ্রহণ করতে হবে। চার দশক সময় অতিবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করেনি। শেকড় প্রথিত হয়নি। বাঙালি জাতির দীপ্ত গৌরবময় স্বাধীনতা দিবস জাতীয় জীবনের একটি গুরত্বপূর্ণ দিন। সুগভীর দেশপ্রেম এবং বীরত্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চির অম্লান হয়ে আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত সাফল্য একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর। এর রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট অতিশয় বেদনার ও সুমহান আত্মত্যাগের। যে সকল দেশপ্রেমিক এই সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদের ত্যাগ ও আদর্শের উজ্জীবনে সাফল্যমন্ডিত করতে হবে স্বাধীনতার মহান অর্জনকে।
বর্ষ পরিক্রমনে বাঙালির দ্বারে দ্বারে ঘুরে আসে এই ঐতিহাসিক দিন। লাল সবুজের পতাকা উড্ডীন হয় আকাশে। আনন্দ-উৎসবে, সভা-সঙ্গীতে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ। নতুন প্রজন্মের কাছে উদ্ভাসিত হয় বাঙালির বীরত্ব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। গত চার দশকে আমাদের সাফল্য অনেকটা ঈর্ষনীয়। আমাদের দারিদ্র কমেছে, আয় বেড়েছে। শিক্ষার মান না বাড়লেও হার বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও তথ্য প্রযুক্তিতে সাফল্য এসেছে। নিঃসন্দেহে আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে, তবে বাঙালি জাতি শ্রম ও রাষ্ট্রের মাধ্যমে এ দেশের খাদ্য উৎপাদনে আমাদের শিল্প ও সেবা খাতে উন্নতি হয়েছে। বাংলদেশের দুর্যোগ  ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যবান বলা যায়। একটি মর্যাদাশীল গতিবান ক্রম-উন্নয়নশীল জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিমাণগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সব পর্যায়ে শিক্ষার মানকে উন্নত করে তুলতে হবে। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে মেধাভিত্তিক করে আরও সক্ষম করে তুলতে হবে। আত্মঘাতি দলাদলির রাজনীতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগকে অবশ্যই তাদের নিজ নিজ বলয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সর্বমহলে একটি জিনিষ উপলব্ধি করতে হবে দুর্নীতিলব্ধ অর্জন কখোনই স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এদেশের অমিত সম্ভাবনা বাস্তবায়নের এক বিরাট অবদান রাখতে পারে। তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বড় করে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে সে সম্ভাবনা আছে তা বিকাশের সুযোগ আমাদের অবশ্যই করে দিতে হবে। এক যোগ্য নতুন বাঙালি তরুণ প্রজন্ম অবশ্যই বাংলাদেশকে তার অতিষ্ঠ উজ্জল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। একটি শোষণমুক্ত মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্য এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে, বৈষম্য দুরীভূত হবে-এসব লক্ষ্য নিয়ে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। বাঙালিরা চেয়েছিল দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট। সে স্বপ্ন সফলও হয়েছিল। সবশেষে যা বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আমাদের গর্ব করে যেতেই হবে। একাত্তরের কাছে আমাদের বার বার ফিরে আসতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে হবে। আমাদের সন্তানদের অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বড় করে তুলতে হবে।
এ. এফ এম ফৌজি চৌধুরী, সংগঠক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ সংবাদ