January 23, 2018

বিজয়

johir vaiমোঃ জহিরুল ইসলাম : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মধ্যে পলাশীর আম্রকাননে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ইতিহাসের পাতায় সেই যুদ্ধ পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত, এ যুদ্ধ প্রায় আট ঘন্টাব্যাপী স্থায়ী ছিল। সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ সেই যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সোনালী সূর্য অস্তমিত হওয়ার ফলে বাংলায় বৃটিশ শাসনের বীজ অঙ্কুরিত হয়। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে বৃটিশ শক্তি আধিপত্য বিস্তার করে অবশেষে সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রায় গোটা ভারতবর্ষ গ্রাস করে এবং এর চূড়ান্ত  পর্যায়ে এশিয়ার অন্যান্য অনেক অংশও তাদের অধীনে চলে যায়। এ পৃথিবীতে অনেক শাসক ক্ষমতা হারিয়েছেন কিন্তু জীবন হারাতে হয়নি, আবার অনেক ক্ষমতা ও জীবন একই সাথে হারিয়েছেন। এমনই একজন শাসক বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা আপন মানুষদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নিজের জীবন এবং সমগ্র রাজ্য ইংরেজদের দখলে চলে গেল। এই করুণ ইতিহাস বাঙ্গালীদের জীবনের এক মর্মান্তিক ঘটনা। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত প্রায় দু’শো বছর বাংলার মাটিতে ইংরেজরা তাদের শাসন ব্যবস্থা বলবৎ রাখে। তখনকার সময় ইংরেজদের শাসন কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় যারা তাদের কথা মতো দেশ চালাবে এরকম লোক দিয়ে শাসন কাজ চালায়। তারা প্রথমে মীর জাফর ও পরে মীর কাশিমকে সিংহাসনে বসায়। মীর কাশিম ছিলেন কিছুটা স্বাধীনচেতা, ইংরেজদের অন্যায় অনেক আবদার তিনি মেনে নিতে পারেননি, ফলে ইংরেজদের সাথে দু’বার যুদ্ধ হয়, ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। এরপর থেকে ইংরেজরা পুরোপুরি ক্ষমতা দখল শুরু করে। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত একশ বছর এদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন চলে, যা ইতিহাসে ‘কোম্পানীর শাসন’ নামে পরিচিত। এই কোম্পানীর প্রধান শাসনকর্তা ছিলেন ’লর্ড ক্লাইভ, প্রায় একশত বছর পরে ১৮৫৭ সালে কোম্পানীর নীতি ও শোষনের বিরুদ্ধে সিপাহী বিদ্রোহ দেখা দেয়।
শোষক শ্রেণী এ বিদ্রোহ দমন করলেও শাসন ব্যবস্থা আর আগের মতো চলতে পারেনি, ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালে কোম্পানী শাসন রদ করে বাংলা সহ ভারতের শাসনভার তাদের হাতে তুলে নেয়, এই শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। প্রায় দু’শো বছরের এই শাসনকালে প্রচুর অর্থ ও সম্পদ এ দেশ থেকে পাচার হয়। বাংলার অর্থনীতির মেরুদন্ড কৃষি ও এককালের তাঁত শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, বাংলার শিল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, অসংখ্য কারিগর বেকার হয়ে যায়। কোম্পানীর শাসনের সময়ে ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ হয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। ইংরেজদের শাসনকে গোটা বাংলার মানুষ কখনও বিনা প্রতিরোধে মেনে নেয়নি। আঠারো শতকের শেষ ভাগ থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত বাংলায় একাধিক প্রতিরোধ আন্দোলন হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে ফকির সন্নাসী বিদ্রোহ, তিতুমীর বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ ইত্যাদি। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল প্রথম বিট্রিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম। এ বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্যে ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা। ঊনিশ শতকের দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। এর ফলে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন হয়। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করার জন্য ১৯০৫ সালে তৎকালীন বাংলা প্রদেশকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়, পুর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে, অবশেষে এ আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে ইংরেজরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। এরই পটভূমিতে মুসলমান সমাজের দাবী দাওয়া তুলে ধরতে মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখনকার সময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ক্ষুুদিরাম ও ‘মাষ্টার দা সূর্য সেন’ কে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং আরও যারা জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রমুখ। এরকম আরও বহুমুখী আন্দোলনের মুখে ব্যাপক চাপে পড়ে এক সময় ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঙ্গালীর এ মুক্তি আন্দোলনে যাদের ক্ষুরধার লেখনি ঔষধের মতো কাজ করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যয়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজি নজরুল ইসলাম অন্যতম। নারী জাগরনের অগ্রদূত বেগম রুকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এ সময় নারী শিক্ষা বিস্তারে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। অবশেষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ সালে বিট্রিশ ভারত বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা ভারত ও পাকিস্তান। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত এর সীমানা চিহ্নিত করা হয়। এই পাকিস্তান ছিল দুটি আলাদা ভুখন্ড নিয়ে, যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে উঠে যার একটি পুর্ব পাকিস্তান অপরটি হল পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান হল যা বর্তমানের বাংলাদেশ, পুর্ব পাকিস্তানের নির্মম ইতিহাস ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন শোষন ও নির্যাতনে ভরপুর। অন্যদিকে ছিল ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন, ১৯৫০ সালে ভূমি সংস্কারের অধীনে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু পুর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সমাজনীতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের পুর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রথম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে প্রায় এক দশক পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেওয়া নানা বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ পুর্ব পাকিস্তানীদের মনে অসন্তোষের বীজ বপিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানীদের এহেন আচরনের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৯ সালে এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয় এবং ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ূব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধীদল বা ‘কপ’ প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পুর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের আন্দোলনের মাইলফলক। পুর্ব পাকিস্তানের স্বাধীকারের প্রশ্ন ১৯৫০ এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসাবে আওয়ামীলীগের উত্থান ঘটে এবং ১৯৬৯ সাল নাগাদ দলটি পুর্ব পাকিস্তান তথা বাঙ্গালী জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ সালে কারাবন্দী করা হয়, ১৯৬৯ সালে আবারও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করে বন্দি করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানের ফলে আইয়ূব খাঁনের সামরিক জান্তার পতন ঘটলেও সাময়িক শাসন অব্যাহত থাকে। কারাবন্দিত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জেনারেল ইয়াহিয়া প্রদত্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং পুর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হন। ১৯৭০ সালে পুর্ব পাকিস্তানে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দেখা দেয় এতে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু এতো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন গলেনি একটুও, তাই কোন সহযোগিতার পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জয়লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বৈঠকে কোন সুফল বয়ে না আনায় ২৫শে মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের অংশ হিসাবে পুর্ব পাকিস্তানীদের উপর নির্বিচারে আক্রমন চালায়। শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার আগ মুহুর্তে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নারকীয় নির্যাতনে বহু মানুষের প্রাণহানী ঘটে। সেনাবাহিনী ও স্থানীয় দালালদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, এইসময় প্রায় ১ কোটি সংখ্যালঘু মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের মুক্তির জন্য নিহত মুক্তিযুদ্ধাদের সংখ্যা ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে এবং সম্ভ্রম হারিয়েছেন প্রায় ২ লক্ষ মা বোন। আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তারা ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস, মুক্তি বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা যুদ্বে বাংলাদেশ জয়লাভ করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরের কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী প্রায় ৯৩,০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সেদিন ঢাকায় দুপুরের পর বাংলার মানুষের মাঝে আনন্দ স্রোত বইতে থাকে, মুক্তিযোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরে সাধারণ মানুষের আনন্দ উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশব্যাপী। স্বাধীন সোনার বাংলা, তাইতো কবি গুরুর সাথে সুর মিলিয়ে গাই  আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…
লেখক-মোঃ জহিরুল ইসলাম
বি.এস.এস (অনার্স) এম.এস.এস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ফার্স্ট ক্লাস, এলএল.বি (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)
উপাধ্যক্ষ, শাহজালাল আইডিয়াল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ। ই-মেইল :

zahirsyl@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ