April 25, 2018

জ্যোতির্ময়ীর স্বপ্ন ভঙ্গ

Selina.jpg---সেলিনা চৌধুরী : মাহফুজ আমার খুব প্রিয় এবং স্নেহের একটা ছোট ভাই। হঠাৎ সে অনুরোধ করলো তাই সামান্য চেষ্টা মাত্র। একদিন এরকমই একটা দিনে হঠাৎ একটা ফোন বেজে উঠলো। আজকের লেখাটা মনের ভেতরের সেই মানুষটা যার ভালোবাসায় আমি সিক্ত ছিলাম। এত মায়া যার কোন সীমানা নাই। সেই অবিনশ্বর ভালোবাসার টানে আজো আমি খোঁজে ফিরি তাকে কিন্তু কোথাও পাইনা। একদিন সকাল বেলা অনেকগুলো পদ্ম ফুল আর পাখীর ডিম এনে দিয়ে বললেন এই নে সবগুলো তোর। আমি তার এতটাই আদরের ছিলাম ছোটবেলা আমাকে কোলে তোলে স্কুলে নিয়ে যেতেন। একবার আমার টনসিল অপারেশন হলো। আমার বয়স তখন ১৫ বছর। খুব সামান্য একটা অপারেশন উনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। অপারেশন শেষ হলো, আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম, উনি আমার জন্য একটা পুতুল, একটা খেলনা গাড়ী, একটা খেলনা হাঁস নিয়ে আসলেন। তার কাছে মনে হতো আমি সেই পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটি আছি তার পরম আদরে বেড়ে উঠা আজকের আমি। দেশকে যিনি খুব ভালবাসতেন। দেশের মানুষের প্রতি যার ছিলো গভীর মমত্ববোধ। আমি তার কথা বলছি। আমার শ্রদ্ধেয় ভাই, আমার “ভাইমনি” এই এলাকা কে তিনি প্রাণের চেয়েও ভালবাসতেন। বিজয়ের মাসকে সামনে রেখে আমি এই ক্ষুদ্র লেখার মাধ্যমে আমার অকাল প্রয়াত ভাইকে স্মরণ করছি। পৃথিবীতে এখন অনেক দীর্ঘশ্বাস। অনেক কষ্ট নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। আমাকে নিয়ে আমার ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিলো। আমার বিয়ের দিন আমি ভূলে গেলাম আমার পায়ে উঁচু হিল, ভারী শাড়ী, গয়নাঘাটি। ভাইমনিকে দেখা মাত্রই পাখীর মতো ছুঁটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। মনে হলো আমি বিশাল মায়ার বাধন হারিয়ে ফেলছি। একমাস ভাইমনির সাদা রংয়ের শার্টে আমার লিপষ্টিকের দাগ রইলো। বিয়ের মাত্র চারদিন পর আমি বিদেশ চলে গেলাম পাঁচ বছরের জন্য। ১৫দিন পরেই ভাইমনি বললেন তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তোর জন্য আমার সারাক্ষণ মন কাঁদে। কবে তোকে দেখবো, একা বের হবিনা, হারিয়ে যাবি, রান্না করবিনা হাত পুড়িয়ে ফেলবি, ট্রেনে-বাসে উঠবিনা কষ্ট হবে। আজ ভাইমনি বেঁচে নেই ইশ্বরের দেয়া শক্তি নিয়ে ভিতরে শান্তি খুঁজি। বিকেলে যখন পার্কে হাটি মনে হয় পিছন থেকে ভাইমনি ডাকছেন। বড় অদ্ভুত মানুষের জীবন। কত অল্পদিন আমরা বাঁচি। কিন্তু এর মধ্যে কতো বিচিত্র ধরণের দুঃখ ও আনন্দ আমাদের জড়িয়ে রাখে। মানুষ যখন হাঁসে তখন তার সঙ্গে সমস্ত পৃথিবী হাসে কিন্তু মানুষ যখন কাঁদে তখন তার সঙ্গে কেউ কাঁদেনা। কাঁদতে হয় একা একা। হুমায়ুন আহমেদ বলতেন,  বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের যিনি নিয়ন্ত্রক তার কি মনে আছে? আমরা ভাবি মানুষের মনে স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি হয়তো দূরে সরে যান। কিন্তু তিনি দূরে যাননা। খুব কাছেই থাকেন। স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণায় মানুষ যখন ছটফট করে তিনিও করেন। কারণ এই স্বপ্নগুলো তো তিনিই তৈরি করেছেন। পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে চলে সেই নিয়মটা কি আমরা ভালোমত জানিনা। প্রকৃতি সব মায়াই রক্ষা করতে চায়। আমরা তুচ্ছ মানুষ, আমরা সেই মহাশক্তির বিপুল রহস্য বুঝতে পারিনা বলেই বিচলিত হই। বিচলিত হবার কিছু নেই। আমার মতো কত  বিশাল ধরণের দুঃখ নিয়ে মানুষ বাঁচে আমরা কেউ জানিনা। প্রকৃতির ভালোবাসাই একমাত্র ভালোবাসা যা কখনো মানুষের সাথে প্রতারণা করেনা। প্রকৃতির অকৃত্রিম ভালোবাসায় বেড়ে উঠছে মানুষ। প্রকৃতি উদার চিত্তে দিয়ে যাচ্ছে মানুষের জন্য অপরিসীম ভালোবাসা। দেশের প্রতি কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাসের অসীম ভালোবাসার এই উক্তি “তোমার প্রান্তর নদী সরোবর অন্তর উদিয়া মোর জুড়ায় অন্তর”। সক্রেটিসের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলছি “আমি এথেন্স বাসী নই, আমি গ্রীক বাসিও নই, আমি বিশ্বের নাগরিক”। হাজার লোকের সাথে চন্দ্রিকাও দেখতে এসেছিলো রিচার্ডের সাথীরা তার সমাধিস্থলে লিখে দিয়েছিলো “অভিশপ্ত মৃত্যুদূত জানেনা, ভালোবাসায় যারা বেঁচে থাকে মৃত্যু তাদেরকে ছোয়না। কতোটা ভালোবাসা বিশ্বাস কতটুকু কতোটা প্রাণের প্রয়োজন কতটুকু কতটা ভাসে। কতোটা ভাসায় অভিলাসে কতটুকু আর সঞ্চয় এই বিনাশ ও বিন্যাসে। যে দূরে চলে গেছে তাকে স্মরণ করাও এক ধরণের ঐক্য ও ভালোবাসা জাগতিক ভালবাসায় জোয়ার ভাঁটার মতন উর্ধ্ব ও অবগতি রয়েছে। রয়েছে আরোহন, অবরোহণ, লয় ও ক্ষয়। নিস্তরঙ্গ, নিরবিচ্ছিন্ন, আদিগন্ত ভালোবাসা নিতান্তই অপার্থিব ও ঐশ্বরিক। জাগতিক ভালোবাসা বার বার পথ চলায় ফিরে আসা। ভালো থাকুক, আমার দেশ, ভালো থাকুক দেশের প্রতিটি মানুষ।
সেলিনা চৌধুরী-সাংবাদিক, কলাম লেখক, সমাজসেবিকা।

সর্বশেষ সংবাদ