January 23, 2018

মেধা ধ্বংসের ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র বন্ধ হোক

FB_IMG_1484231984692-7রায়হান আহমেদ তপাদার : এই সুন্দর পৃথিবীকে কল্যাণকর কিছু যে বা যারা  দিয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই ডিগ্রিবিহীন ও নম্বরবিহীন মানুষ।কবি গুরু,জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম,পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ভারতের লালবাহাদুর শাস্ত্রী,ভারতের ইন্ধিরা গান্ধী,বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও জন মেজর. বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী প্রয়াত এস এম সুলতান, শিক্ষাবিদ প্রয়াত আবুল ফজল,কবি সুফিয়া কামাল,সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও জহুর আহমেদ চৌধুরী খুঁজলে এমন অনেক উদাহরণ মিলবে।আবারো বলি,আমাদের শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের অন্তরায় হচ্ছে নোট বা গাইড বই এবং কোচিং ব্যবস্থা। পারিপর্শ্বিকতায় অভিভাবকরা সে পথে ঝুঁকতে বাধ্য হন। বাধ্য করা হয়। জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে মেধা ও বুদ্ধি সম্পন্ন সুশিক্ষিত প্রজন্ম প্রয়োজন। তা করতে হলে মেধা চর্চার সকল ব্যবস্থা উন্মুক্ত করতে হবে।পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে মেধাবী বলা কতটুকু সমীচীন?সেটা বিবেচনার বিষয়। লক্ষ্যনীয় আমাদের দেশে মেধাবীদের মূল্যায়ণ কখনো হয়নি,হবার সম্ভাবনাও দেখছি না। এ পর্যন্ত অনেক মেধাবী আমলা দেখেছি,তারা জাতিকে কিছুই দিতে পারেননি শুধু জি হুজুর জি হুজুর ছাড়া। বরং বিভিন্ন নথিতে মেধার প্যাচ লাগিয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত করেছে। মেধাসম্পন্ন মানুষ নিজ নিজ বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়। মেধা আপেক্ষিক বিষয় মেধা চর্চার পথ সুগম করতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিকতা সম্পন্ন বিবেকবান শিক্ষিত মানুষ সৃষ্টি করা দরকার শিক্ষার্থীকে মেধাবী বলা হচ্ছে এমন প্রায় ৯০% ইংরেজিতে একটি আবেদনপত্র লেখার যোগ্যতা অর্জন করেনি। অনেকেই বাংলায় লিখতেও পারে না।সে মেধাবী দেশবাসীর কী কল্যাণে আসবে?  সিংহভাগই দেশ ও জাতির বোঝা।এদের বিরাট একটা অংশ লাখ লাখ টাকা দিয়ে সরকারি চাকরি পেতে চায়। হচ্ছেও তাই। চাকরির সার্কুলার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি মহল অগ্রিম টাকা নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়, সে অনুযায়ী চাকরিও হচ্ছে।মেধাবীরা চাকরি পায় না,মেধার মূল্যায়ন নেই।মেধাবী শব্দ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার  প্রয়োজন আছে কী আর? এই মেধাবীদের অধিকাংশ নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করে না,অনেক ক্ষেত্রে পাস করায় ও না,পাস করলেও নিয়োগ পত্র পায় না। কারণ চাকরি হয় অর্থের বিনিময়ে,মেধার ভিত্তিতে নয়। মেধার বিকাশ ও মূল্যায়ন জরুরি। মেধাসম্পন্ন জাতি পেতে হলে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কেনার ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। চাকরির বেলায় মেধা ও যোগ্য ও নিরীহদের মূল্যায়ন করতে হবে,না হলে জাতি অন্ধাকার পথে তলিয়ে যাবে। ঘুষবিহীন গরিব মানুষের যোগ্য সন্তানের চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হবে।শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশে সামগ্রিকভাবে একটা সমালোচনা চলছে।অনেক দিন আগে থেকেই মেধাবীদের মূল্যায়ন ও শিক্ষা পদ্ধতিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।পাসের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কতটা মেধাবী শিক্ষার্থী বের করতে পারছি আমরা,তা নিয়েই মূলত প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ভালো ফল করা ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন মেধা পরীক্ষায় হতাশ করার মতো ফল করছে।দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।শিক্ষিত বেকার বৃদ্ধি দেশের জন্য কোনো সুখকর খবর নয়। কিন্তু সেটাই ঘটে চলেছে। কয়েক বছর আগে থেকে অনেকেই দেশের মেধাবীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে আসছেন। মেধা মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে মূলত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু কোনো মতেই যেন এর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।এবং কিভাবে এর সমাধান হবে তা নিয়ে ভাববার সময় যেন কারো নেই। আমাদের জাতিকে এভাবে মেধাশূন্য করার পেছনে যারা কাজ করে যাচ্ছে তাদের খুব দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ছাত্রছাত্রী থাকবে, শিক্ষক থাকবে,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে; তবে লেখাপড়া করার বা করানোর খুব বেশি দরকার হবে না। রাত জেগে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ারও দরকার হবে না। আর সেটা হলে আমাদের বিপদ বাড়বে।প্রশ্ন ফাঁস কেন হয়? যদি এই প্রশ্ন থেকে সমাধানের চেষ্টা করি তাহলে পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে যে দুটি পরীক্ষা হয় সেদিকেও তাকানো দরকার। বিষয়টি অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে।আসল কথা হলো, প্রশ্ন শিক্ষকদের প্রণয়ন করার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই তা পাবলিশার থেকে কিনে আনে। এর কারণ মূলত দুটি।প্রথমটি হচ্ছে;প্রাইভেট শিক্ষকরা যাতে তাদের প্রাইভেটের ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন কমন না ফেলতে পারে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে শিক্ষকরা পরিশ্রম করতে চান না। প্রশ্ন তৈরি করা অনেকের কাছেই একটা বোঝা। তাইতো গাইডগুলো বহাল তবিয়তে বাজারে চলে। কারণ খোদ শিক্ষকরাই তো সেগুলো থেকে প্রশ্ন করে। আবার সরাসরি কমনও পড়ে। ভাবা যায়, সৃজনশীল প্রশ্নও কমন পড়ে!প্রাইভেট ব্যবসা অনেক পুরাতন এবং এটি বহাল তবিয়তেই চলছে। এখন যারা যে শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে পরীক্ষার আগে সেসব শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন অনেকেই আগে থেকেই বলে দেন। আজ যে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে তার একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে টাকা। আজকের শিক্ষার্থীদের পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।এবেলা-ওবেলা তাদের প্রাইভেট কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এত কিছুর পর তাদের মেধার প্রতি সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু মেধাবী জাতি নিয়ে আমরা শঙ্কিত। মেধাবী জাতি গঠনে তাই শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। সবারই জানা আছে,যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত।কিন্তু কোনো শিক্ষিত জাতি যদি নকল করে পাস করে,তবে সেই জাতি কি উন্নত হবে?পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস যেন এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে!গত ১০ বছর ধরে তা-ই দেখা যাচ্ছে।ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখাবিমুখ হয়ে পড়েছে।নকল করে পাস করার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।শিক্ষাঙ্গনের মতো পবিত্র স্থান থেকেই যাদের দুর্নীতির হাতেখড়ি,তারা এ জাতিকে কতদূর নিয়ে যাবে তা সহজেই অনুমেয়।আগামী প্রজন্মকে যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়ার কথা,সেখানে অন্যায় করা শিখানো হচ্ছে।এভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে নকল তুলে দিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে তাদের মেধাশক্তিকে।শুধু যে একাডেমিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে,তা নয়।বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্রও ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। জাতি গড়ার পেশা হল শিক্ষকতা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য,শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার এনটিআরসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও দেদারসে ফাঁস হচ্ছে।এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে যে কোনো কম্পিউটারের দোকানেই পাওয়া যায় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি বর্তমানে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অনায়াসেই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন।শক্তিশালী সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে।তারা প্রচুর টাকা ঢালছে এ ব্যবসায়।সবচেয়ে বিস্ময়কর, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকার ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে। জাতি গড়ার কারিগররা যখন সামান্য টাকার লোভে পুরো জাতিকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়,তখন লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা থাকে না। আমাদের দেশে শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রতিবছর এসব খাতে খরচ হয় অজস্র কোটি টাকা। তবে কাজের কাজ কী হচ্ছে, তার খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আইন করে কখনো কখনো নোট বা গাইড বই এবং কোচিং বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এরই মাঝে একশ্রেণির লোভী শিক্ষক বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে ফেরেন। এর মাধ্যমে যে তারা জাতির অবিনাশী ধ্বংস বয়ে আনছেন, তাদের কে বোঝাবে? তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একশ্রেণির অসাধু মুনাফা লোভী ব্যবসায়ী, এনসিটিবি। অবশ্য সেখানেও কেউ নেই খবরদারি করার। পাশের হার বৃদ্ধি যে শিক্ষার মান বৃদ্ধি নয়; শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির অর্থ যে জ্ঞানের পরিধি, পরিমাণ বৃদ্ধি,মূর্খত্ব দূর করা- তা যেন সংশ্লিষ্ট সবাই ভুলে গেছেন। অভিভাবকরা প্রতিযোগিতায় নেমেছেন মোহর আলীর ছেলে গোল্ডেন-এ পেয়েছে তো আমার মেয়েকেও তাই পেতে হবে। কেন পাবে না? কিনে আনব প্রয়োজনে। আজকাল দেশে মূর্খের সংখ্যা এমন বেড়েছে যে,কথায় কথায় বলে ফেলে ভাই যদি কিছু লাগে বলবেন। নিজে নষ্ট হয়েছে, অন্যকেও নষ্ট করার কাজে নিয়োজিত থাকে তারাই। বিদ্যা যে কেনার মতো বস্তু নয়, হীরা, সোনা, জামাকাপড়,খাট-পালঙ্কের তো বস্তু নয়,এই বাস্তব সত্যটি অনুধাবনের যোগ্যতা আমরা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছি।যে দেশে সার্টিফিকেট কিনতে পাওয়া যায় সে দেশে জ্ঞান কী ভাতের সঙ্গে খাবে নাকি লোকে? মনে রাখতে হবে  সার্টিফিকেটই জ্ঞান নয়,জ্ঞানই সার্টিফিকেট। লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ