February 20, 2018

লাল টমেটোতে কমলগঞ্জের কৃষকদের সবুজ হাসি

Tometoতানভীর আঞ্জুম আরিফ : কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষক নূর মিয়ার এবার মুখের হাসিটা একটু চওড়াই। এবার টমেটো চাষ করে বেশ স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাকে অনুসরণ করে আরও ১৫/২০ জন টমেটো চাষে এগিয়ে এসেছেন। খরচের দ্বিগুণের বেশি লাভের আশাও করছেন কৃষকরা। কমলগঞ্জ উপজেলার বালুঝিল এলাকায় পা রাখলেই চোখে পড়বে চিকন বাঁশের কঞ্চির আড়ালে সবুজ গাছের সমারোহ। একটু এগিয়ে কাছে গেলে দেখা যাবে টমেটোর সবুজ গাছে ফুল ও ফল ধরতে শুরু করেছে। বছরে চার বার গাছ থেকে টমেটো তোলা হয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।কৃষকরা জানান, চৈত্র মাস থেকে শুরু হয়ে যায় চারা লাগানো। আবার কখনো কখনো আরো পরে অর্থাৎ আষাঢ় মাস থেকে। আর ভাদ্র মাসে ফল বিক্রি শুরু হয়। বীজ বপন বা চারা লাগানোর দু’মাসের মধ্যে ফল ধরতে শুরু করে। আগাম টমেটো চাষ করলে অধিক দামে বিক্রি করা যায় বলে কৃষকরা আর্থিকভাবে বেশ লাভের মুখ দেখেন বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কৃষকদের চিন্তার কারণও আছে ‍কিছু। টমেটো গাছের রোগব্যাধি কৃষকদের বেশ ভোগাচ্ছে। কোনো কোনো গাছ লাল হয়ে কুঁকড়ে গেছে আবার কোনো গাছের কচি টমেটোগুলোতে নিচে থেকে পচন ধরা শুরু করেছে। আবার কোনো কোনো গাছে প্রচুর টমেটো ধরেছে। আধা পাকা টমেটোর ভারে গাছ নুয়ে পড়ছে কিছু গাছ। পঁচন রোগ ও গাছ-মরা রোগে দিশেহারা কৃষকেরা। অথচ এই বিষয়ে নেই কৃষি বিভাগের কোন তদারকি।
টমেটো ক্ষেতের কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে অনেক লোক কাজ করছে। কেউবা সুঁতো দিয়ে গাছগুলো বাঁধছে। কেউ ঘাস পরিষ্কার করছে। কেউ আবার ওষুধ ছিঁটাচ্ছে। এখানকার টমেটোর খেতগুলোতে শিশুসহ ৭০-৮০ জন লোক নিয়মিত কাজ করে। তবে ফসল তোলার সময় কাজ করে প্রায় দেড়শ লোক। জমির মালিকদের কাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে জমি নিয়ে চাষ করছেন অনেক টমেটো চাষী। জমির মালিকদের কয়েকজন হচ্ছেন বিশ্বনাথ, নিমাই, হরিদাস, ফুল মিয়াসহ অনেকে। জায়গাটা উঁচু বলে টমেটোর চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত জায়গা। এখানকার সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে জায়গা নিয়ে চাষ করেন নূর মিয়া নামে এক ব্যক্তি। তার বাড়ি পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন আদমপুরের বনগাঁও গ্রামে। তিনি ওই এলাকার কাদির খানের ছেলে।টমেটো ক্ষেতে কাজ করছে ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া হাসান মিয়া ও সাজু মিয়া। তারা  জানায়, কখনো কখনো স্কুল বাদ দিয়ে ১’শ টাকা মজুরিতে তারা টমেটোর ক্ষেতে কাজ করে। এরা ছাড়াও সেখানে ফজল মিয়া, কালাম মিয়া, মানিক চাঁদসহ কয়েকজন শিশুশ্রমিককেও কাজ করতে দেখা যায়। শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগানের শ্রীমান দাস জানায়, বাগানে কাজ না থাকায় ২’শ টাকা মজুরিতে এখানে সে কাজ করছে। টমেটো ক্ষেতে কাজ করেন মুজাম্মিল মিয়াও। তিনি  জানান, তিনি ৫ বছর ধরে টমেটো খেতে দৈনিক ৩শ টাকা মজুরিতে কাজ করে সংসার চালান।টমেটো চাষী নাহিদ মিয়া আপন মনে টমেটোগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। সাংবাদিক শুনে এগিয়ে আসেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১২ সালে প্রথমে এক একর জায়গা লিজ নিয়ে টমেটো চাষ শুরু করেন। সে বছর ১ লক্ষ টাকা খরচ করে লাভ হয় ২ লক্ষ টাকা। সেই থেকে প্রতি বছর টমেটো চাষ করে যাচ্ছেন। তার সাফল্যের কথা শুনে এলাকার আরও ১৫/২০ জন টমেটো চাষে এগিয়ে এসেছেন। এখন তারা সবাই মিলে ১৫ একর জায়গাতে টমেটো চাষ করছেন। নাহিদ মিয়া আরো জানান, এ বছর তিনি ২ একর জমিতে টমেটো চাষ করছেন। তার খরচ হবে ৬ লক্ষ টাকা। টমেটো বিক্রি করবেন ১৫ লক্ষ টাকার। খরচ বাদে তার লাভ হবে ৮ থেকে ৯ লক্ষ টাকা। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের ব্যাপারে অভিযোগের অন্ত নেই তার। জানালেন, গত ৫ বছরে একদিনের জন্যও কোনো কৃষি কর্মকর্তা তাদের এখানে আসেননি। কৃষি কর্মকর্তারা যদি তাদের সঠিক পরামর্শ দিতেন তবে গাছ বা ফলন নষ্ট হতো না। তাদের ফলন আরও বেশি হতো, লাভও বেশি হতো।রোগ বালাই হলেও অতিরিক্ত কীটনাশক তিনি টমেটো গাছে বা টমোটোতে দেন না। অনেক শিক্ষিত ছেলে চাকরি না খুঁজে কৃষিক্ষেত্রে অবদান রাখার আহ্বান জানান নাহিদ মিয়া।

নাহিদ মিয়া ছাড়াও এখানকার অন্যসব টমেটো চাষী হলেন নাজমুল মিয়া, মান্নান মিয়া, আব্দুস ছালাম, রেজ্জাক মিয়া, জয়নাল মিয়া, হুরমান মিয়া, কুদ্দুছ মিয়া, আবু তাহের, মৃণাল, ছায়েদ, সবুজ, নওশাদ ও সাবেক ইউপি সদস্য বীরবল প্রসাদ পাল।বীরবল প্রসাদ পাল জানান, দীর্ঘদিন ধরে নূর মিয়াকে দেখে তারও টমেটো চাষের ইচ্ছা জাগে। তুলনামূলক কম কষ্ট করে অধিক ফলন ও লাভ পাওয়া যায় বলে তারা টমেটো চাষ করছেন। টমেটোর লাভে এখন তাদের পরিবার ভালোই চলছে। পাশাপাশি অনেকের কাজের ব্যবস্থাও হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামছুদ্দিন আহমদের কাছে টমেটো চাষীদের পাশে না দাঁড়ানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তার জানা ছিল না। আগামীকাল বিকেলেই তিনি টমেটো চাষের এলাকাটা ঘুরে দেখবেন। টমেটো চাষীদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সর্বশেষ সংবাদ