September 24, 2017

সৈয়দ মহসীন আলী একটি নাম একটি ইতিহাস

syeda-sanjida-sharmin-300x202সৈয়দা সানজিদা শারমিন : সৈয়দ মহসীন আলী। ছাত্রলীগের জন্মের পর থেকে রাজনীতির মাঠে পথচলা। ছাত্রনেতা,যুবনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামীলীগ নেতা, পৌরসভার চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি , জাতীয় সংসদের দু’বারের সংসদ সদস্য, সমাজসেবক, জনসেবক, সাংস্কৃতির সেবক, ক্রীড়াযোদী, শিল্পী, সবশেষে সমাজকল্যান মন্ত্রী, বিশেষনের শেষ নেই তার দীর্ঘ ৫০ বছরের জীবনে রাজনীতির পরতে পরতে যার প্রবেশ তিনি মহসীন আলী। মৌলভীবাজার বাসী ও দেশের জনমানুষের জন্য তার মৃত্যু সংবাদ একটি মর্মস্পশী দুঃসংবাদ ছিল। দেশ ও জাতির জন্য ত্যাগী তাই রাজনীতিকছিলেন অনন্য। দেশ অন্ত:প্রাণ একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি।

মৃত্যুর আগে সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় জাসদ এর মঈনুদ্দীন খান বাদল এম.পি গিয়ে ছিলেন আব্বাকে দেখতে। হয়তো আব্বা বুঝেছিলেন তার সময় ফুরিয়ে এসেছে।আব্বা বাদল চাচাকেসেদিন বলেছিলেন, বাদল ভাই আমার দেশটাকে দেখে রাখবেন। সত্যিই হৃদয়স্পশী কথা। অস্্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় প্রচুর কাজ করে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আব্বাকে স্বাধীনতা পদক ২০১৭ তে ভূষিত করেন। মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তী সত্যিই বিরল ঘটনা। স্বাধীনতা পদক পেয়ে সহসনি আলী অন্য এক উচ্চতায় চলে গেলেন। রাজনৈতিক জীবনে যখন তার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা সম্পাদন করেছেন অপরিসীম নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে। আজীবন সংগ্রামী মহসীন আলী মানুষ, সমাজ ও দেমের কল্যানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থাকতেন। কীভাবে মৌলভীবাজারের উন্নয়ন করা যায় সেই চিন্তাই করতেন। মন্ত্রী হওয়ার পর পুরো মৌলভীবাজার শহরের সৌন্দর্য্যবর্ধনের বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলেন । পুাো শহর ফুলে ভরিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন জাযগায় ফুলের- ফলের চারা লাগিয়ে ছিলেন। শহরের রোড ডিজাইগুলো এখন পুষ্পপল্লবে মেতে উঠে। নতুন প্রজাতির অনেক আমের চারাও লাগিয়েছিলেন। অত্যন্ত সৌখিন একজন মানুষ ছিলেন আব্বা। আতর সংগ্রহের ঝোঁক ছিল। বিভিন্ন দেশের আতর সংগ্রহ করতেন। বিশ্বের অনেক দামী আতর সংগ্রহ ছিল তার। মাঝে মাঝে মানুষকে আতর লাগিয়ে দিয়ে আনন্দ পেতেন। দেশ বিদেশের নামী লেখকদের বইও সংগ্রহ করতেন। ম্যাগাজিনও চিনতেন প্রচুর। কত বিচিত্র বই আর ম্যাগাজিন। আমি সাংবাদিকতার অনার্স-মাস্টার্স করেছি। আব্বার বই আর ম্যাগাজিন পড়তে পড়তেই মনে মনে ঠিক করেছিলাম সাংবাদিকতারপড়ব। গান আর কবিতার প্রতি তার অন্যরকম আকর্ষণ ছিল। গানের লিপির বই আর কবিতার বইও পড়তেন। ইংল্যান্ড আর ইন্ডিয়া থেকে কবিতার বই কিনতেন। মাঝে মাঝে সঞ্জতার কবিতা আবৃত্তি করতেন আর গান গাইতেন নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দেয়ার জন্য। আমরা তিন বোনের একটা দুঃখ থেকেই গেছে আমরা গান শিখতে পারিনি।

মন্ত্রী হওযার পর মনে করেছিলাম একটি গান শিখে তাকে চমকে দেব। তিনি এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন যে চমকে দেয়ার সুযোগই পেলাম না আব্বাকে নিয়ে লিখতে গেলে মনের মধ্যে কত স্মৃতি যে উকি দেয়? লিখে শেষ করা যাবে না । মানুষকে খাওয়াতে পারলে আব্বা সবচেয়ে খুশি হতেন। মেহমানদের জন্য কী রান্না হবে তা আম্মাকে বলতেন। আম্মার প্রতি ছিল তার অগাধ আস্থা।বলা নেই কওয়া নেই। হঠাৎ করে বলতেন ৩০ জন খাবেন বা ৫০ জন খাবেন। আম্মা রেডী করতেন। আজ আমার আম্মা আব্বার আসনে এম.পি। এটা মনে হয় আল্লাহর অশেষ রহমত আর আব্বার ভালো কাজের উপহার। আব্বা অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। কোনোদিন দেখিনি কোনো বিষয়ে নিয়ে জটিলভাবে চিন্তা করতে। শিশুর মতো মন ছিল তার। মানুষ তাকে কষ্ট দিলেও কোনোদিন ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। ঢাকা থেকে কোনো অতিথি এলে তাকে আমাদের বাসায় খাওয়াতে হবে এটাকে মহসীন আলীর বাড়ীর ঐতিহ্য করে ফেলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উপর আব্বার অবিচল আস্থা ছিল। তিন বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে আব্বা বলেছিলেন, শেখ হাসিনা যেভাবে এগিয়েগিছে, তিনিই একদিন বিশ্বের নেতৃত্ব দিবেন। কথাটি আজ সত্যিই প্রমাণিত। শেখ হাসিনা এখন আর্ন্তজাতিক নেতা। রঙ বেরঙের পোষাক পড়তেন আব্বা।

মৌলভীবাজারের প্রতিটি পরিবারের সাথে মিশে ছিলেন। তাদের অতি আপনজন ছিলেন তিনি। রাস্তায় চলাচলের সময় তার বাসা সামনে পড়ত তার বাসায় উঠে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন আব্বা। মন্ত্রী হওয়ার পর তা করতেন। আমাদেরকে বলতেন আজকের মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী ই মানুষগুলোই আমাকে বানিয়েছে। আমার ছোট বোন সাবরিনা একদিন আব্বাকে বলেছিল আব্বা আমাদের জন্য কিছু রেখে যাচ্ছ না। কিছু হলে আমাদেরকে কে দেখবে। আব্বা তখন বলেছিলেন, মৌলভীবাজারবাসী দেখবে। আজ সত্যিই আমাদেরকে দেখছে মৌলভীবাজারবাসী। আজ ্আমরা তোমার অর্জনে গর্বিত সৈয়দ মহসীন আলী। গর্বের সাথে সবাইকে বলি আমরা মহসীন আলীর সন্তান। তোমার মতো সৎ ও ত্যাগী নেতার শুন্যতা উপলদ্ধি করছে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় সবাই।

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি তোমার দেখানো আদর্শের পথে চলতে পারেন, তবে সেটাই হবে সৈয়দ মহসীন আলীর প্রতি সবোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন। বিনম্র শ্রদ্ধায় আর গভীর ভালোবাসা ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে।

সৈয়দা সানজিদা শারমিন
মহসীন আলী কন্যা
ফ্রীল্যাসার জার্নালিস্ট।

সর্বশেষ সংবাদ