September 24, 2017

লালন অনুরাগী সালামত খান

 মফিজ ইমাম মিলনd4751629ef0cbba58261481786eccae5-59b4fc2b63e53

সালামত খান গবেষক, তার্কিক-তাত্ত্বিক এবং বাউল-ফকির-পীর-মুর্শিদ অনুরাগী। সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে তার সখ্য এবং আপোষহীন উচ্চারণের কারণে তিনি নন্দিত। কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তে বসেই যিনি জ্ঞান চর্চা করেছেন। উইলিয়াম ব্লেইকের বাঘের মতোই যিনি ছিলেন জ্বলন্ত। গত আগস্ট ছিল তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

কোনো লেখা লিখতে গিয়ে এতোটা অসহায় আর বিপন্ন বোধ করিনি, যতোটা করছি আমার বহুলাশেং আত্মীক সম্পর্কের  অন্তরঙ্গ সুহৃদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ সালামত হোসেন খানকে নিয়ে। সালামত খান কে? তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন, অসমাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান-মনস্ক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা এক মফস্বল সাংবাদিক। তিনি সবকিছুতেই সাড়া দিতে চাইতেন। তরঙ্গের চূড়ায় চূড়ায় নৃত্য করার একটা কামনা তার মধ্যে সুপ্ত ছিল। তাঁর মধ্যে একটা বাউল-মন বাস করত, সেটাই তাঁকে উতলা রাখত সর্বক্ষণ।
প্রতিভা-ভাস্বর মানুষের কি মৃত্যু আছে? প্রতিভার কি দাহ আছে? এমনসব প্রশ্ন তাঁকে ঘিরেই করা যায়। পেশাগত পরিচয়ে সাংবাদিক হলেও তিনি ছিলেন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। কিন্তু তিনি সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, মনোবিজ্ঞানসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রেই বিচরণ করতে আনন্দ পেতেন। দ্রুতবেগে কথা বলতে তার সমকক্ষ আর কাউকে দেখি না। স্পষ্টভাষী, অসামান্য মেধাবী এবং শাণিত বুদ্ধিসম্পন্ন এই মানুষটিকে সামনা-সামনি কেউ অপছন্দন করলেও পিছনে তারিফ করতেন, তাঁর মেধা-মননের।সব তারকা ব্যক্তিত্বরই ভক্ত থাকে অগণিত। কবি থেকে ক্রিকেটার, নায়িকা থেকে গায়িকা- এরকম তারকাদের ভক্ত-সংখ্যা সীমাহীন। জনপ্রিয়তার মাত্রাভেদে এই ভক্ত সংখ্যার তারতম্য ঘটে। পড়ুয়া সমাজে লেখকদেরও ভক্ত থাকে তবে পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন। সালামত খানের ভক্ত অনুরক্ত বিশেষ কিছু সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর অনুরাগী ছিলেন গরীব-মিসকিন, পীর-ফকির, আউল-বাউল ও বিভিন্ন পেশার গুণী ও গুণীনদের মধ্যেও। তিনি লালন দর্শনে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। ফলে ঐ সমাজের সকল ঘরানার মানুষের মধ্যেই ছিল ওঠবস।

বাবা মোজাফ্ফর হোসেন খান ছিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার। তাঁর কর্মস্থল রংপুরের মহাকুমা শহর নিলফামারিতে সালামত খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারিতে। বাবার চাকুরির বদৌলতে ফরিদপুরে আসেন ১৯৬২-তে। ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে এস,এস,সি পাস করে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তিও হন। এরপর আর কলেজমুখী হননি। ১২ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। ভাইবোনেরা সকলেই প্রচণ্ড মেধার অধিকারী। জীবিতদের মধ্যে কেউ বিজ্ঞানী, কেউ ডাক্তার, রাষ্ট্রদূত, গবেষক, ব্যারিস্টার ও আমলা। তাদের অনেকেই প্রবাসী। শুধুমাত্র এক ভাই সরাফত হোসেন খোকনকে নিয়ে তিনিই ফরিদপুরের বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির অংশীদার ছিল তাদের হাতেই লালিত-পালিত বিচিত্র পশুপাখি। এক সময় সাপও পুষতেন।

সাংবাদিকতার হাতে খড়ি হয়েছিল ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত অধূনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘গ্রগতির দিন’ থেকে। পত্রিকার প্রকাশক প্রয়াত মঞ্জুর মোর্শেদ এবং সম্পাদক মাহফুজুল আলম, তাঁকে নিয়ে আসেন সংবাদপত্রের জগতে। এরপর খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক পূর্বাঞ্চল’পত্রিকার ফরিদপুর প্রতিনিধি হয়েও কাজ করেছেন। তবে সাংবাদিকতায় যতটা না জড়িত ছিলেন তার চেয়ে বেশী সম্পৃক্ত ছিলেন সামাজিক সংগঠনগুলোতে। ফরিদপুর প্রেসক্লাবের বিভিন্ন সময়ের দুর্যোগ মুহূর্তগুলোতে মোকাবেলা করেছেন বলিষ্ঠতার সাথে। পাশাপাশি বার্ষিক সাধারণ সভা, বনভোজন, নির্বাচন এমনকি সংবাদ সম্মেলনগুলোতেও তাঁর সরব উপস্থিতি টের পাওয়া যেত।

ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ফরিদপুর ডিবেট ফোরাম, মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সংসদ, ফরিদপুর, শাপলা (পতিতালয় শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র), ব্লাস্ট, ফরিদপুর শাখাসহ যতগুলো পীর-ফকিরের মাজার-আস্তানা রয়েছে এর অধিকাংশের সাথেই তার যোগযোগ ছিল। এবং তিনি দয়াল-মুর্শিদ, গুরু-সুফিবাদ সম্পর্কে যেমন লেখাপড়া করতেন, তেমন জানতেন এবং বলতেও পারতেন।

কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে লিখতে গেলে অনেকক্ষেত্রে আমি ও আমিত্ব চলে আসে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে যাঁরা ছিলেন এবং আছেন তাঁদের সাথে সম্পর্ক থাকাতেই এমনটি হয় বেশি। ফরিদপুরের লোকসংস্কৃতি, লোকগান, লোকচিকিৎসার সাথে জড়িত এমন ব্যক্তিদের সাথে আমার যোগাযোগ অনেক দিনের। তাদের একত্রিত করে বহু জায়গায় আনন্দ ভ্রমণেও গিয়েছি। এই সকল ভ্রমণে সালামত খান পাঁচ-দশজন শিল্পীকে আমার দলের সাথে পাঠাতে পেরে আনন্দিত হয়েছেন। লোকগানের কিংবদন্তী শিল্পী প্রয়াত হাজেরা বিবির ওরস মোবারকে নিজে কাঁধে করে চাউল পৌঁছে দিয়ে অনেক শিষ্য-সাগরেদকেই অবাক করেছেন। অহমিকা বা হিংসা বিদ্বেষ বলতে যা বুঝায় তা তার মধ্যে ছিল না। তবে গ্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক থাকায় বিপরীতমুখীদের সাথে সম্পর্ক ছিল অনেকক্ষেত্রেই শিথিল।

জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সম্পাদক পদে ২০০২ থেকে প্রায় ৭ বছর দায়িত্ব পালন করি। একবার জসীমউদ্দীন হলে তিনদিন ব্যাপী লোকসংস্কৃতি উৎসব আয়োজন করি। কয়েকজন লোকসংগীত শিল্পীকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ সময় সালামত খান ফকির আবদুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়ায় সকলেই সহমত পোষণ করেন। এই অনুষ্ঠানে হাজেরা বিবি, আয়নাল বয়াতী, ফকির আবদুর রহমান ও জালাল বয়াতীকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল।

পরম ধার্মিক ও সাধু লালন ছিলেন দশ সহস্র শিষ্যের ‘মানবগুরু’। তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না নারী-পুরুষের পার্থক্য। তাই হিন্দু-মুসলমান ও নারীপুরুষ নির্বিশেষে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই অনুরাগী ভক্ত-সম্প্রদায়কে তিনি ‘সত্য কথন সত্য ব্যবহার’ শিক্ষা দিতেন আলাপচারিতায় ও গানের মাধ্যমে। লালন অনুরাগী ভক্ত সালামত খান যেন সেই দীক্ষাটি নিয়েই চলাচল করতেন এই সমাজ সংসারে। মৃত্যু ধ্রুব সত্য। এই সত্য যে এত তাড়াতাড়ি তার বেলায় কার্যকর হবে সে কথা স্বজনরা কেউই বুঝতে পারেনি। বুকের ব্যথায় ফরিদপুর হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। এরপর ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট দেহ রাখেন এই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষটি।

মফিজ ইমাম মিলন : লেখক, সম্পাদক- ‘উঠোন’

সর্বশেষ সংবাদ