September 25, 2017

বিদেশে জুতো পালিশের চাকরি

fojlul bari- l copyফজলুল বারী : আবু হাসান শাহরিয়ার দেশের একজন স্বনামখ্যাত কবি, লেখক, সাংবাদিক। আশির দশকে বাংলাদেশে যে ক’জন উজ্জ্বল তরুণ কবি নিজস্ব স্বকীয়তার গুনে প্রিন্ট মিডিয়ায় আলো ছড়িয়েছেন আবু হাসান শাহরিয়ার তাদের অন্যতম। সম্প্রতি বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের উদ্দেশে জুতো পালিশের কাজের কটাক্ষ জাতীয় তার একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অনেকে আমার ইনবক্সে তার বক্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠিয়ে এ নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেছেন। আবু হাসান শাহরিয়ার কোন প্রেক্ষিতে কার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে এ ধরনের অবিশ্বাস্য একটি মন্তব্য করেছেন তা আমার জানা নেই। তার কাছে আমি বিষয়টি আশা করিনি। কারন বড় হৃদয়ের মানুষেরাই কবি, লেখক, সাংবাদিক বা শিল্পী হন। আবু হাসান শাহরিয়ারের বক্তব্যটি অবশ্য বাংলাদেশের চলমান সমাজের অপ্রত্যাশিত একটি অংশ। যে সমাজ ঘুষ-দুর্নীতি-তদবির-তোষামোদিকে প্রশ্রয় দেয়। এসবকে প্রভাব-শক্তিমত্তা হিসাবে দেখে। মানুষের কায়িক শ্রমকে দেখে বর্ণবাদী দৃষ্টিতে। বাংলাদেশের সমাজে যারা জুতো সেলাই-পালিশের কাজটি করেন তাদের অমানবিক বর্ণবাদী দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাদের সামাজিক নাম মুচি। এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বেরুবার পর এক ধরনের নিউজ হয়, রিকশা চালকের বা বুয়ার ছেলে বা মেয়ে জিপিএ-ফাইভ পেয়েছে। বা মুচির ছেলে বা মুচির কাজ করে অমুক পেয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। এই কাজগুলো যারা করেন তারা যে একেকজন সৎ মানুষ, কারো মুখোপেক্ষি না, ঘুষ-দুর্নীতির বাইরে দাঁড়িয়ে লড়াকু একজন মানুষ, এসব রিপোর্টে সে অ্যাঙ্গেলটি সচরাচর থাকে না। কারণ আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত বর্ণবাদী সমাজ বিষয়টি সেভাবে চিন্তা করতে অথবা দেখে অভ্যস্ত না। অবশ্য দিনে দিনে অবস্থা পাল্টাচ্ছে।

এখন বিদেশের একজন জুতো পালিশওয়ালার প্রসঙ্গে আসি। অস্ট্রেলিয়ায় আমি দশ বছর ধরে আছি। বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক হিসাবে অনেকগুলো দেশে রিপোর্ট করতে গেছি। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে আরব দেশগুলো ছাড়া আমাদের দেশের মুচি তথা জুতো পালিশওয়ালা চরিত্রটিই দেখিনি।

এ দেশের শপিংমলগুলোর কোন কোনটিতে সু-মেকার বলে একটি চরিত্র তথা দোকান আছে। এরা বিশেষ কোন সৌখিন ব্যক্তির জুতো সারানোর কাজ করেন। যে কোন ছোটখাটো কাজে এদের ডিমান্ড দশ ডলার বা এরচেয়েও বেশি। সে কারণে এরা প্রচুর কাজও পান না। জুতো পালিশ যদি কেউ করেন শপিংমলগুলো থেকে ওয়ানটাইম সরঞ্জামাদি কিনে নিয়ে তা নিজে নিজেই করেন।

এসব দেশে ধুলোবালির সমস্যা কম। কেডস কালচারের দেশ এগুলো। আমাদের অনেকগুলো কেডস একসঙ্গে জমিয়ে তা ওয়াশিং মেশিনেই ধুয়ে নেই। নিজের চামড়ার জুতো নিজেরাই মুছে নেই বা পালিশ করে নেই। এর বাইরে অন্য কারো কাছে যাবার বিলাসিতা বা সামর্থ্য আমাদের নেই।

21463118_1994416567447812_8119791468026888509_nজিমি কার্টার যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন বাংলাদেশের মিডিয়ার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে তিনি একজন বাদাম চাষী! বাদাম ফলিয়ে বিক্রি করতেন আর কী! কিন্তু আমেরিকা বা উন্নত বিশ্বের চাষী তথা ফার্মার চরিত্রটি যে কী ধনাঢ্য ব্যক্তির সে ধারনা আমাদের দেশের অনেকেরই নেই।

এসব দেশের ফার্ম হাউস, ফার্মার মানে বিশাল কিছু। দেশগুলোর কান্ট্রি সাইডে বিশাল এলাকা জুড়ে এসব ফার্ম হাউস। ফার্ম হাউসের মালিক ফার্মাররা এসব দেশের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাদের বাড়ি সবচেয়ে সুন্দর, গাড়ি সবচেয়ে সুন্দর। অনেকের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার, জেট বিমান এসবও আছে। কাজেই জিমি কার্টার বাদামচাষী বলে আমরা যখন নিউজ লিখেছি সেটি আমাদের চিন্তার দৈন্য থেকেই লিখেছি।

মুচি তথা জুতো পালিশওয়ালা সম্পর্কে আরেকটি তথ্য দেই। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বাঙালি এলাকা লাকেম্বা লাগোয়া সাবাটির নাম ওয়ালি পার্ক। জেমস ওয়ালি নামের একজন মুচি তথা সু-মেকারের নামে এলাকাটির নামকরন হয়েছে। অকৃতদার ছিলেন জেমস ওয়ালি। তার মৃত্যুর পর উইলে পাওয়া গেলো তার তিরিশ একর জমি তিনি বাচ্চাদের কোন কাজে লাগানোর জন্যে স্থানীয় ক্যান্টাবারি সিটি কাউন্সিলকে দান করে গেছেন।

কাউন্সিল তখন তার জমিতে একটি সবুজ উদ্যান তথা পার্ক প্রতিষ্ঠা করে সেটির নামকরণ করেছে ওয়ালি পার্ক। স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের নাম ওয়ালি পার্ক পাবলিক স্কুল। এখানে ওয়ালি পার্ক গার্লস হাইস্কুল নামে মেয়েদের একটি স্কুল আছে। রেলস্টেশনের নামও ওয়ালি পার্ক।

অস্ট্রেলিয়ায় আমি সোশ্যাল ওয়ার্ক হিসাবে বাংলাদেশি তরুণ ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজ করি। এটা আমার কোন স্বীকৃত কাজ বা কোন কিছু পাবার আশায় করা কাজ না। যেহেতু জীবনে অনেক মানুষের সহায়তা পেয়েছি, এটি এর কিয়দংশ ফেরত দেবার চেষ্টা, এক ধরনের ব্যক্তিগত বিনোদন কার্যক্রমও বলতে পারেন।

পড়াশুনা করতে নতুন আসা ছেলেমেয়েদের বিমান বন্দরে রিসিভ করা, একটি বাসা খুঁজে দেয়া, একটা কাজ খুঁজে দেয়া, প্রথম দিনগুলোতে গাড়িতে করে এখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া এই কাজগুলোতে সহায়তার চেষ্টা করি। প্রথম কাজগুলোর মধ্যে আছে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া, ট্যাক্সফাইল নাম্বার করে দেয়া, স্বাস্থ্যবীমার অফিসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টেশনে নিয়ে যাওয়া এসব। আমার অভিজ্ঞতা প্রথম একটা মাস কাউকে একটু সাপোর্ট দিলে চলে।

এরপর আর লাগে না। আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা তখন নিজে নিজেই চলতে পারে। বাংলাদেশের মেধাবী, ক্রিম ছেলেমেয়েরা আইএলটিএসে ৬-৭ স্কোর করে, অভিভাবকের আর্থিক সচ্ছলতা দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে পড়াশুনা করতে আসে।

এদের বেশিরভাগ দেশে কোনদিন কোন কাজ করেনি। অনেককে মা ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দিয়ে খাইয়েছে। কিন্তু এই ব্যয়বহুল দেশে আসার পর এরা পাগলের মতো কী কাজ খুঁজে জানেন? এর সিংহভাগ মূলত কিচেনহ্যান্ড অথবা ক্লিনিং। রেস্টুরেন্টের পিছনে থালাবাটি পরিস্কার থেকে শুরু করে দ্রুততম সময়ে করতে হয় এমনসব কাজ।

যেহেতু প্রথম আসা ছাত্রদের এর বাইরে প্রাথমিক কাজ তেমন নেই সেহেতু এই কাজগুলোই খুঁজে দিতে তাদের সহায়তা করি। প্রথমদিন কাজের ট্রায়ালে গিয়ে আমার অনভ্যস্ত এমন কত প্রিয় প্রজন্ম ছেলেমেয়ে যে বিরতির সময় টয়লেটে ঢুকে হাউমাউ করে কাঁদে। কাজ থেকে ফেরার পর কত ছেলেমেয়েকে যে আমি নিজের হাতে প্যানাডল টেবলেট খেতে দেই।

কারণ পরেরদিন তাকে আবার কাজে যেতে হবে। একটা ছেলেমেয়েদের এদেশে সপ্তাহে বাসাভাড়া, খাবার-ফোন-ট্রান্সপোর্টের খরচই ৪-৫শ ডলার। এরপর আবার প্রতি সেমিস্টারে টিউশন ফী আট থেকে আঠারো হাজার ডলার! অনেক ছেলেমেয়েকে দিয়ে আমি তাদের প্রথম সপ্তাহের রোজগারের টাকা তাদের মায়ের কাছে পাঠাই।

যে ছেলে কোনদিন কাজ করেনি, প্রতিদিন পাঁচশ- এক হাজার টাকা পকেটমানি না দিলে ঘরে চিল্লাচিল্লি করেছে সেই ছেলের পাঠানো টাকা পেয়ে মা অঝোরে কাঁদেন। ওই টাকা নিজে খান না, গরিব লোকজনকে খাওয়ান। আপনি আমার এই ছেলেমেয়েদেরও অপমান করেছেন আবু হাসান শাহরিয়ার। কিচেন-ক্লিনিং এর কাজে যে কষ্ট তা শুধু এরাই জানে। জুতোপালিশ বা পোশাক শ্রমিকের কাজও যদি তারা পেতো তাদের এত কষ্ট করতে হতো না। দুর্ভাগ্য হচ্ছে এ শিল্পগুলো এদেশে নেই।

এক সময় উচ্চ শিক্ষার জন্যে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে ছেলেমেয়েরা বিদেশে যেতো। এখন অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ছেলেমেয়েরা আসে পড়াশুনা শেষ অভিবাসনের আশায়। কারণ নানান দুর্ভাগ্যজনক কারণে দেশ তাকে আর স্বপ্ন দেখাতে পারে না।

এছাড়া ছেলেমেয়েরা বিদেশে অন্য একটি সৎ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিচেনে কাজ করুক অথবা যেখানে কাজ করুক শতভাগ সৎ আয়। কারন এখানকার জীবন ঘুষ-দুর্নীতি-তদবির-তোষামোদি মুক্ত। নিরাপদ খাবার-পানি, সামাজিক নিরাপত্তা এসবে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতেও অনেকে দেশে ফিরতে ভয় পায়।

বাংলাদেশে খেলতে গিয়ে সিরিজ সেরার পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনিং ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। আমি সিডনি এসে পেয়েছি এখানকার হিলসডেল উলওয়ার্থে কাজ করতেন ডেভিড ওয়ার্নার। এটি ঢাকার আগোরা, মিনাবাজারের মতো একটি মুদির দোকান।

এটাই অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর জীবন। বাংলাদেশে যেমন একটি সংসারে একজন বাবা বা কেউ একজন উপার্জন করেন, পুরো পরিবার মিলে বসে খায়, এটি বিদেশে অকল্পনীয়। দেশের এই সামাজিক চিন্তার পরিস্থিতির কারণেও অনেক বাবা দুর্নীতি করেন।

কারণ একজনের আয়ে দুর্নীতি ছাড়া সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব না। অস্ট্রেলিয়ায় আমি বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনায় আসতে উৎসাহিত করি। কারণ এখানে সে পড়বে নিজের উপার্জনের টাকায়। বাংলাদেশে থাকলে বাবার টাকায় পড়তো। সন্তানের পড়ার খরচ জোগাতে বাংলাদেশের অনেক বাবাকে দুর্নীতি করতে হয়। ছেলে নিজের টাকায় পড়লে বাবাকে অন্তত দুর্নীতি করতে হবে না।

বাংলাদেশের এখন প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে আছেন। আমাদের পারিবারিক কাঠামো বন্ধনের কারণে এই এক কোটি মানুষ দেশে নিজের পরিবারের কাছে টাকা পাঠান। পরিবারের কারো চিকিৎসা, বিয়ে, পড়াশুনা উপলক্ষেও বাড়তি টাকা পাঠাতে হয়। সবাই নিজেদের ফিতরা, জাকাত-কুরবানির টাকাও বরাবরের মতো এবারও দেশে পাঠিয়েছেন।

এসব টাকার সিংহভাগ যায় আমাদের গ্রামের অর্থনীতিতে। এসব কারণে পরিবারগুলোতে সচ্ছলতা এসেছে। এবং এই টাকাগুলোর বেশিরভাগ বিদেশে আমাদের লোকজনের অডজবের কষ্টের টাকা। বিদেশে অবশ্য কাজ কাজই। অডজব বলে কিছু নেই। কারণ সপ্তাহ শেষে সংসার চালাতে হাজার ডলার লাগে। দেশেও টাকা পাঠাতে হয়। এমন একটি দেশ-সমাজের একজন সচেতন কবি-লেখক-সাংবাদিক কী করে এ ধরনের একটি মন্তব্য করতে পারেন?

এটি যে কী পরিমাণ ক্রোধ সৃষ্টি করেছে প্রবাসীদের মাঝে তা কী তিনি জানেন? একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশি একটি ছেলে তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসে লিখেছে, ‘শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, তাই আজ আর জুতো পালিশ করতে গেলাম না।’ ছেলেটার ছবি দেখতে গিয়ে চোখে পানি চলে এসেছে। আবু হাসান শাহরিয়ার তার বাবার বয়সী হবেন। বাবা কি কখনও পারেন সন্তানকে নিয়ে এরকম তাচ্ছিল্য করতে পারে? কিন্তু আপনি পেরেছেন।

দুঃখিত কবি, আপনাকে মনে করে এসব স্মৃতি ভেসে উঠছে আর এতো এতো কথার অবতারণা করতে হচ্ছে বলে। লেখার শুরুতে বলেছি আবারও বলছি আমরা জানতাম, বড় হৃদয়ের মানুষেরাই কবি, লেখক, সাংবাদিক বা শিল্পী হন। কিন্তু মনে হচ্ছে আবু হাসান শাহরিয়ার ব্যতিক্রম।-পরিবর্তন

ফজলুল বারী: পরিব্রাজক সাংবাদিক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।
fazlulbari2014 @gmail.com

 

 

 

সর্বশেষ সংবাদ