November 21, 2017

মরণঘাতী যুদ্ধের জন্য শাসকরাই দায়ি

FB_IMG_1484231984692রায়হান আহমেদ তপাদার : যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা দিয়েই শুরু করলে মন্দ কী।তিনি গেল এক বছরে এমন সব মন্তব্য করেছেন,এমন সব আচরণ করেছেন, যা দেশটির ইতিহাসে বিরল। মনে আছে, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন মনিকা লিওনস্কির সঙ্গে কেলেঙ্কারির কারণে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান অল্প বয়সে সুইমিংপুলে নারীর মাথায় পা রেখে যে বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেজন্য তাকে অনেক বিব্রত হতে হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের মুখে যেন কোনো লাগাম নেই। তিনি একবার বলেই দিয়েছেন, অসংখ্য নারীসঙ্গ করেছেন, নারী তার কাছে ভালো লাগে। এ পর্যন্ত ধরে নেয়া যায় ‘হতেই পারে’। কিন্তু তিনি একবার বলেছেন, বহু নারীর গায়ে তিনি হাত দিয়েছেন। সত্যি কথা কী, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সম্প্রদায় অত্যন্ত নাখোশ হয়ে আছে। এর অধিকাংশই তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণের কারণে। বহু মানুষ ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে এখন আক্ষেপও করছেন। আমরা একবিংশ শতাব্দীতে এসে উন্নত দেশগুলোয় অন্তত প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানের ভাবগাম্ভীর্য, কথাবার্তায় শালীনতা, বক্তব্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার আশা করা হয়ে থাকে। যে কোনো দেশের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় কূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগ এবং ঝগড়ায় শব্দ ব্যবহারে তাদের সতর্ক থাকতে হয়। তবে অতিসম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানদের আচরণ ও কথাবার্তায় অতিমাত্রায় অস্বাভাবিকতা প্রবেশ করছে। দেশে দেশে এমন সব মানুষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা যে কোনো সময় লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ফেলতে পারেন। অন্যদিকে ৩০ বছর ধরে জিম্বাবুয়ে শাসন করছেন রবার্ট মুগাবে। ৯৩ বছর বয়স্ক এই প্রেসিডেন্ট কয়েকদিন আগে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবেন। অংশ নেয়া তো নয়, মানে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে তার আবার ক্ষমতায় আসা। অর্থাৎ তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবেই মরতে চান। অস্বাভাবিক কথা ও আচরণে তার জুড়ি মেলা ভার। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন যুক্তরাষ্ট্রে সমকামী বিয়ের বৈধতা দিলেন, তখন মুগাবে বললেন, আমি হোয়াইট হাউসে গিয়ে ওবামার পাণি প্রার্থনা করব। মুগাবে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কথা বলেছিলেন, ব্লেয়ার কে? সে হলো একজন প্রধানমন্ত্রী। আর আমি হলাম প্রেসিডেন্ট! মুগাবের স্ত্রী গ্রেস মুগাবে অতি সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে এক মডেল কন্যার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করে, যাতে গ্রেস মুগাবে বের হতে না পারেন। হলে কী হবে, যার স্বামী রবার্ট মুগাবে, তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা ধরে রাখবে এত সোজা? তিনি প্রথম পদক্ষেপেই দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রীবাহী বিমান জিম্বাবুয়েতে অবতরণ নিষেধ করেন। জিম্বাবুয়েতে অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার বিমান আটকে দেন যাতে উড়ে যেতে না পারে। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি! দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রেস মুগাবেকে ছেড়ে দিল।অপরপক্ষে ১৯৭১ সালে উগান্ডায় সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইদি আমিন বাবা প্রেসিডেন্ট মিল্টন ওবোতেকে হটিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্ট বনে যান। শুরু হলো এক উদ্ভট শাসন। ৮ থেকে ৯ বছর তিনি অস্ত্রের মুখে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল ছিলেন।  কিন্তু অশিক্ষিত, ব্রিটিশ অফিসারদের পাচক থেকে কমান্ডার পর্যন্ত পদোন্নতি পাওয়া এ পাগলা কিসিমের প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা দখল করেই ভাবলেন, ব্রিটিশ তথা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তিনি জয় ছিনিয়ে এনেছেন। তিনি আদেশ দিলেন কিছু সাদা চামড়ার মানুষ ধরে আনতে। নিজের ক্ষমতা গ্রহণ সেলিব্রেট করবেন। একটি আসন তৈরি করলেন। তার ওপর তিনি বসবেন এবং শ্বেতাঙ্গ লোকেরা পালাক্রমে কাঁধে করে তাকে রাজধানী কাম্পালা ঘোরাবেন। তিনি তাই করলেন। সাদা চামড়ার লোক, অর্থাৎ ব্রিটিশদের ধরে এনে তাদের কাঁধে চড়ে কাম্পালা ঘুরলেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব কামুক প্রকৃতির। প্রতিদিন ৫০টি কমলালেবু খেতেন এ বিশ্বাসে যে, তিনি আমৃত্যু কামুক থাকবেন। এমন অনেক কাহিনী আছে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ের। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে অনেক পাগলা, আধাপাগলা শাসক দেখা যেত। আমরা কুখ্যাত রোমান সম্রাট কালিগুলার কথা অল্পবিস্তর জানি। সেসব আবার বেশিরভাগই নিষ্ঠুর কাহিনী। তিনি মানুষ মরতে দেখে আনন্দ পেতেন। তাই লোক ধরে এনে হত্যা করে মজা করতেন। তিনি নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে তার নামে প্রার্থনা দাবি করতেন। নিজের আপন বোনকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস ক্ষমতায় এসে এত ভালো কাজ করেন যে, তার নামের সঙ্গে প্রিয় রাজা উপাধি জুড়ে যায়। কিন্তু একবার তার ম্যালেরিয়া হয়। ভীষণ উচ্চমাত্রায় জরের পর তিনি অন্য মানুষ হয়ে যান। এ রাজারই পরে পাগলা রাজা বলে খেতাব জুটে যায়। অটোমান সুলতান ইব্রাহীমকে বলা হতো পাগলা ইব্রাহীম। তার কায়কারবার এতটাই অসংগতিপূর্ণ ছিল যে, তার মা তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চেষ্টা করেছিলেন।  একবিংশ শতাব্দীতে এসে উন্নত দেশগুলোয় অন্তত প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানের ভাবগাম্ভীর্য, কথাবার্তায় শালীনতা, বক্তব্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার আশা করা হয়ে থাকে। যে কোনো দেশের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় কূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগ এবং ঝগড়ায় শব্দ ব্যবহারে তাদের সতর্ক থাকতে হয়। তবে অতিসম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানদের আচরণ ও কথাবার্তায় অতিমাত্রায় অস্বাভাবিকতা প্রবেশ করছে। দেশে দেশে এমন সব মানুষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা যে কোনো সময় লঙ্কাকা-বাধিয়ে ফেলতে পারেন। আর ঝগড়ার চেহারা তো আমাদের ‘কানুর মা’র পর্যায়ে নেমে গেছে। । ওই দিকে আছেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। সমাজতান্ত্রিক এ দেশে তিনি নেতৃত্ব পেয়েছেন পৈতৃক সূত্রে। ২৭ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রচ- বৈরিতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি একাধিক জেনারেল এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং দুর্নীতির নামে মৃত্যুদ-দিয়েছেন। বছর দুয়েক আগে তার ভাষণের সময় একজন জেনারেল ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। উন সম্প্রতি আমেরিকার কোয়াম নামের একটি দ্বীপে পারমাণবিক হামলার তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। ডেটলাইন ছিল ১৫ আগস্ট। তিনি বলে আসছেন, যুদ্ধ বাধলে তিনি জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবেন। দুই নেতার মধ্যে যে বাকবিতন্ডা তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের নানা দেশে এখন একটি প্রশ্ন উঠেছে,কে বেশি উন্মাদ ট্রাম্প না উন?  ফিলিপাইনের রদ্রিগো দুতার্তে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী নানা কারণে আলোচিত। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে অভিযান শুধু করেছেন তিনি। পুলিশকে বিনা বিচারে হত্যার অনুমতি দিয়েছেন। একবার বললেন, আমি মেয়র থাকতে নিজের হাতে একাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে হত্যা করেছি। একবার রসিকতা করে তিনি বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছেন। বলেছেন, শিশুদের ধর্ষণ আমি পছন্দ করি না। তবে বিশ্বসুন্দরী হলে তুমি বলাৎকার করতে পার। আফ্রিকার ইকোইটারিয়াল গিনিতে ৪০ বছরাধিককাল প্রেসিডেন্ট পদে বহাল আছেন গিইমা বাগবো। তিনি নির্বাচনের সময় হলে নির্বাচন কমিশন দিয়ে রেডিওতে একটি ঘোষণা দেওয়ান, গিইমা পেয়েছেন ৯৫ ভাগ ভোট, নিকটমত প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৩ ভাগ। অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীও তিনি নিজে ঠিক করে দেন। মিসর থেকে ভাড়া করা মার্সি নারীরা তাকে পাহারা দেয়। তিনি যখন ২০টি গাড়ির বহর নিয়ে রাস্তায় ধুলি উড়িয়ে যান, তখন রাস্তায় কারও অবস্থান করার নিয়ম নেই। এসব আবার পশ্চিমারা দেখে না। কারণ গিনি দেশটি ছোট হলেও তেলের ওপর ভাসছে। ওই তেলের প্রায় পুরো লাভ চলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একজন অস্বাভাবিক মানুষ।এদের মতো অস্বাভাবিক আচরণ ও চিন্তার মানুষদের দিয়েই একটি মরণঘাতী যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া সম্ভব হয়। আশঙ্কার কথা হলো, তৃতীয় বিশ্বের পাশাপাশি উন্নত বিশ্বেও এমন উদ্ভট স্বভাবের লোকের আগমন ঘটছে।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ