November 24, 2017

বানভাসি মানুষ বনাম এবারের ঈদ

FB_IMG_1484231984692রায়হান আহমেদ তপাদার : বন্যা একটি দুর্যোগ,যা প্রকৃতির স্বভাব মেনেই আবির্ভূত হয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে কারো সন্দেহ নেই। তবে এখন যে বন্যা হচ্ছে তাতে প্রকৃতির হাত খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। মানুষের অপকর্মের খেসারত এই বন্যা। বর্তমানে সেই বন্যার মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরাঞ্চলের অর্ধ কোটি মানুষ। অনেকের মতে, এক সময়কার বন্ধু পার্শ্ববর্তী দেশের হাত রয়েছে এই বন্যায়। এটা আজ সর্বজন স্বীকৃত। এ জন্য এই বন্যাকে যতটা না প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি বলা হচ্ছে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। এ কথা অস্বীকার করার কোনো জো নেই, ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার কারণে ডুবে গেছে আমাদের উত্তরাঞ্চল। যে বাঁধটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য মারণবাঁধ নামে পরিচিত। যার কারণে শুকনো মৌসুমে আমরা পানির দেখা পাই না।নষ্ট হয়ে যায় শত শত হেক্টর জমির ফসল। রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু একটি রঙ ‘সাদা’চোখে পড়ছে। সর্বনাশা বন্যার পানিতে অন্য সব রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে। যে মাঠ সবুজ-শ্যামল-সোনালি সবজিক্ষেত ও ধানক্ষেতে পূর্ণ থাকার কথা, সেখানে আজ শুধু পানি আর পানি। বিশাল বিলের দুই পাশের টলমলে পানিতে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক ভাসছে। গাড়ির চাপে কোথাও কোথাও রাস্তা নরম হয়ে স্পঞ্জের মতো দুমদুম করছে। এত দুঃখ-দুর্দশা থাকলেও মানুষ থেমে নেই। অভিযোগ থাকলেও তাদের কর্মচঞ্চলতার পথ রুদ্ধ হয়নি। ওরা সবাই আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়। সুদৃঢ় করতে চায় বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাদের সে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটুক এবার সরকারের নেয়া কৃষিবান্ধব পরিকল্পপনায় এ প্রত্যাশা রইল। সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। এখন ধীরে ধীরে সে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে সত্যি; তবে এসব দুর্গত এলাকার ফসলি জমিতে যেখানে ‘সোনালি ধান’ ছিল, তা পচে এখন সে জমিতে যেন দগদগে ঘা বের হচ্ছে।এ ঘা প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কলিজায়ও আমরা অবগত হয়েছি, দুর্গত মানুষের সে আর্তনাদ ও কান্নার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় খবরে দেখেও বিত্তবান অনেকেই ‘উফ…উফ সারাক্ষণ বিরক্তিকর খবর, এসব খবর আর ভালো লাগে না’ এ রকম নানা মন্তব্য করে চ্যানেল পরিবর্তন করে বিনোদনের চ্যানেলে নজর ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ দুর্গত সেসব মানুষের দুঃখ-কষ্ট কেমন, কীভাবেইবা তারা জীবন কাটাচ্ছে, তা একটু বোঝানোর চেষ্টা করছি।একদিকে ঈদ যেমন আমাদের মাঝে আনন্দের বার্তা বয়ে আনছে, অন্যদিকে সারা দেশে ভয়াবহ বন্যা ঈদের এ আনন্দকে নিরানন্দ করছে। এবারের এ ঈদের আনন্দের মাঝে আমরা কি বন্যাপীড়িত শত শত অসহায় মানুষের কথা একবারও মনে করেছি? কেমন কাটবে তাদের এবারের এ ঈদ, আমরা কি কখনও তা ভেবে দেখেছি? এবারের বন্যায় সব হারিয়ে তারা কি পারবে আর সব মানুষের মতো নিজ নিজ সন্তানদের নিয়ে ঈদের এ আনন্দঘন মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে? ঈদের দিনে অন্তত সন্তানদের মুখে একটু ভালো খাবার ও পরনে একটি নতুন বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে, নাকি অন্ন ও বস্ত্রহীন অবস্থাতেই কাটবে তাদের ঈদের দিনটি? এরই মধ্যে বন্যা যাদের সর্বস্ব গ্রাস করেছে, বসতভিটা হারিয়ে বাঁচার তাগিদে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে, তাদের কাছে এবারের ঈদ কেমন কাটবে এ বিষয়গুলো কি একবারও আমাদের চিত্তে কখনও নাড়া দিয়েছে?  আসুন আমরা সবাই মিলে বন্যাপীড়িত সেসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং যার যতটুকু সাধ্য আছে, তা দিয়ে তাদের মাঝে ঈদের আনন্দকে জাগিয়ে তুলি। শুধু নিজেদের বিত্তে ও বিলাসিতায় নয়, অন্যকে দানের মাঝেও যে চিত্তে সুখ আছে, তা খোঁজার চেষ্টা করি। এতে হয়তো এক ধরনের আত্মতৃপ্তি মিলবে।দুঃখজনক হলেও সত্য, এবারের এ আনন্দময় ঈদে আমাদের মাঝে আতঙ্ক হয়ে নেমে এসেছে ভয়ালগ্রাসী ও সর্বনাশা বন্যা, যা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অনেকাংশে পিছিয়ে দিচ্ছে ও মানুষকে করছে সর্বস্বান্ত। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকাই এখন বন্যার পানিতে প্লাবিত। এসব অঞ্চলের বন্যাপীড়িত মানুষের জীবন আজ ভয়াবহ বিপন্ন ও দুর্বিষহ। জানমাল, সহায়-সম্পত্তিহীন শত শত পানিবন্দি বন্যাপীড়িত ক্ষুধার্ত ও রোগেশোকে আক্রান্ত মানুষের আহাজারি এখন যেন দেশের সর্বত্র বিরাজমান।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যাপীড়িত অনাহারী মানুষের করুণ আর্তনাদ প্রতিনিয়ত সেখানকার আকাশ-বাতাস ভারি করছে। দেশের এমন অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল আছে, যেখানে এখনও প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণসহ কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখনও লাখ লাখ পরিবার পানিবন্দি গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে এক রকম মানবেতর দিন যাপন করছে। তাদের কাছে এবারের ঈদ আনন্দের নয়, তা যেন একরকম অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ এ বন্যায় তাদের মাঝ থেকে ঈদের এ আনন্দ যেন বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে কাজের আশায় পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  ভাবতে দুঃখ হয়, যদিও সরকারের তরফ থেকে এসব বন্যাপীড়িতের ভাগ্যে কিছুটা ত্রাণ মেলে,   তা-ও অনেক সময় তাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে না। বিপরীতে তাদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত যৎসামান্য খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ বা ত্রাণ যা-ই আসুক না কেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেকে তা-ও করে আত্মসাৎ। হায়রে আমাদের মানবতা ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার নমুনা! ভাবতে কষ্ট লাগে, নিজেদের হীনস্বার্থে ও ত্রাণের যৎসামান্য অর্থের লোভে প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের মানবতাকে করছি পদদলিত এবং অসহায় সেসব মানুষকে করছি বঞ্চিত। তবে এটাই কি আজ আমাদের সমাজের আসল বাস্তবতা? একজন মানুষ অন্য আরেকজন মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াবে, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা ও সেবা দিয়ে আপ্লুত করবে, একে অপরের আনন্দে আনন্দিত এবং দুঃখে ব্যথিত হবেÑ এটাই তো স্বাভাবিক, আর এ-ই তো হওয়ার কথা। কিন্তু আজ হচ্ছে এর উল্টোটা। আমরা চাই এ অবস্থার দ্রুত অবসান হোক।আসুন আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সে মানবপ্রীতি জাগিয়ে তুলি এবং আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি। সবাই মিলে ঈদের এ আনন্দযজ্ঞে বন্যাপীড়িত শত শত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কিছুটা হলেও অর্থ-শক্তি-সাহস দিয়ে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করি। আসুন আমরা সবাই মিলে মানবতার এ মহান সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করি। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে বানভাসি লাখ লাখ মানুষের বিপন্ন ও বিপর্যস্ত জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসি।  আসুন বন্যাপীড়িত অসহায়দের মাঝে অর্থ দিয়ে, নয়তো সাহস দিয়ে এবারের এ ঈদের আনন্দটুকু আমরা সবাই মিলে তাদের সঙ্গে উপভোগ করি। এতে যে আত্মতৃপ্তি ও আনন্দ মিলবে, তা হয়তো অন্যান্য আনন্দের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বাতাসে আজ কান্নার আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে। ভেসে আসছে সর্বস্বহারা কিছু মানুষের আর্তনাদ। দুই মুঠো খাবারের আশায় আশ্রয় কেন্দ্রে কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন। কখন আসবে একটু সাহায্য। সেই প্রতীক্ষায় যেন নিরানন্দেই কেটে যাচ্ছে তাদের সময়গুলো। আমরা কি পারি না বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে, তোমাদের কোনো ভয় নেই। আমরা তোমাদের পাশে আছি এবং থাকব। আমরা যাই হই না কেন, আস্তিক অথবা নাস্তিক। মানবতার আর্তনাদের সামনে আমাদের মাথা অবনত হতে বাধ্য। তাই নিজ উদ্যোগে হোক বা যৌথ কোনো উপায়ে হোক এই সম্পদহারা মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। আমরা কি একটুুও ভেবে দেখব না, ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধকোটি মানুষ কী করে ঈদ উদ্যাপন করবে? যেখানে দুবেলা দুমুঠো খাবারের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে হচ্ছে, তাদের ঈদটা কেমন কাটবে! ঈদের আনন্দকে আমরা ভাগ করে যদি তাদের ঘরে পৌঁছে দেই, তাহলে কী আমাদের আনন্দে কোনো ঘাটতি পড়বে। না, ঘাটতির প্রশ্নই আসে না। বরং কোরবানির আনন্দ আরো বিকশিত হবে।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ