November 21, 2017

নানা বৈচিত্র্যে মুসলিম বিশ্বের ঈদ উদযাপন

FB_IMG_1484231984692রায়হান আহমেদ তপাদার : বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে ঈদ উদযাপনের তেমন কোনো পার্থক্য না থাকলেও দেশে দেশে সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে ঈদ উৎসবের কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা বিভিন্ন রকমে এ ঈদ উৎসবের আয়োজন করে। চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ঈদের দিন নানা ক্রীড়া-কৌতুকের আয়োজন করা হয়। ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যবস্থাও করা হয়।আরব ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় ও নানাবিধ খেলার আয়োজন করা হয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়ায় যুদ্ধের কুচকাওয়াজ ও সে ধরনের দৌড়ঝাপের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের দেশের মতো ঈদ উপলক্ষে কোথাও কোথাও মেলাও বসে। শিশুদের নানাবিধ খেলনা এসব মেলার অন্যতম আকর্ষণ। ঈদ উৎসবে মেতে আছে পুরো বিশ্ব।ঈদের আনন্দে সারা বিশ্বের মুসলমানরা শামিল হয়েছিল ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের পরিচ্ছদে। মানুষে মানুষে বিভেদ ভুলে আনন্দ আর উৎসবমুখর পরিবেশে স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে কেটেছে সময়।সময়ের চাকায় ভর করে মুসলমানদের দুয়ারে কড়া নাড়ে ঈদ। প্রতি বছর দুটি ঈদ পালিত হয়। ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। জীবনে নব উদ্যমের চেতনা নিয়ে। সুখ বিলাসের ছায়াদার বিশাল শামিয়ানা নিয়ে। ঈদ মানবজীবনে বইয়ে দেয় সুখের মাতোয়ারা। আনন্দ বাসনার সমুদ্দুরে ঢেউ খেলে যায় নান্দনিকতায়। মনের মাধুরীতে সুখ-স্বপ্নরা নেচে ওঠে অপার মহিমায়।প্রাণের টানে একে অন্যের কাছে ছুটে গেছেন, আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন।সারা বিশ্বেই এ আনন্দের রেশ এখনো রয়েছে।কেউ কেউ ছুটি কাটাতে ছুটছেন পর্যটন কেন্দ্রে।কেউ স্বজনদের নিয়ে আড্ডায় মজেছেন।  তাছাড়া একেক দেশে এ আনন্দ উদযাপনের ভঙ্গি একেক রকম। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, আসাম, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, জম্মু-কাশ্মীর, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠী ঈদ পালন করছে মহা সমারোহে। মূলত এখানকার মুসলমানরা ছাগল ও উট কোরাবানি করেছেন ধর্মীয় রীতি মেনে। কলকাতার রেড রোডে, দিল্লির জামে মসজিদ, আগ্রার তাজমহলের সম্মুখ স্থানসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে বড় বড় ঈদ জামাত। যেখানে অংশ নিয়েছেন লাখো মুসল্লি। আহমেদাবাদের কুতব-ই-আলম প্রান্তরে মেয়েদের একটি বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।অপরদিকে মুসলিম দেশ পাকিস্তানে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজধানী ইসলামাবাদের ফয়সাল মসজিদে।বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এদিন দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ঈদ জামাতের স্থানগুলোতে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে পাকিস্তান সরকার। আর সবার মতোই পাকিস্তানিরাও দেশ ও জাতি এবং সারাবিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন ঈদ মোনাজাতে। এরপর পশু কোরবানির পাশাপাশি পারিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে দিন পার করছেন পাকিস্তানিরা।তাছাড়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ শ্রীলঙ্কাতেও প্রায় ২০ লাখ মুসলমানের বসবাস। সোমবার তারা মহা সমারোহে উদযাপন করেছেন পবিত্র ঈদুল আজহা। দিনটিকে সরকারি ভাবে ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে।অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনটি পালিত হয়েছে আনন্দের আতিশায্যেই। এছাড়া বৃটেনেও এবারের ঈদ আনন্দের কমতি ছিল না।প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তার বার্তায় বিশ্বের মুসলমানদের সুখ শান্তি কামনা করেছেন।তিনি এও বলেছেন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা প্রয়োজন। ঈদের নামাজ আদায় ও পশু কোরবানির পাশাপাশি নানাভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন ইসরায়েলের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত অঞ্চলটির মানুষেরা।সেখানে শিশু-কিশোর ও নারীদের জেনিনের ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক সিটির একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্কের নাগরদোলায় চেপে আনন্দ করেছেন বলে জানা গেছে।এদিন ইসরায়েলের বিশেষ অনুমতিতে ৫০০ ফিলিস্তিনি জেরুজালেমের স্মৃতিবিজড়িত আল আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম এমন সুযোগ পেয়েছেন তারা।এবং ধর্মীয় রীতি-নিতি আর ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে আনন্দের মিলমিশে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে পুরো বিশ্বেই।অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিল ক্লিনটনের সময় থেকে ঈদ উদযাপনের রীতি প্রচলিত ছিল।কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আলাদা কোনো আয়োজন করেননি। ওদিকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো পশ্চিম জাভার সাকাবুমির মেরদেকা স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করেন। সেখানেই তিনি সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতা ও কূটনীতিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি সাকাবুমিতে আসেন ট্রেনে চেপে। উইদোদো হাসিম আজহারি মসজিদসহ দেশের অন্যান্য মসজিদের কোরবানিতে অংশও নিয়েছেন।আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি প্রেসিডেন্টের বাসভবনের মসজিদে মন্ত্রিসভার সদস্য ও উচ্চতর কর্মকর্তাদের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করেন। এরপর সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আঙ্কারার মসজিদে নামাজ শেষে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।এবং তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইরানে শিয়া সংস্কৃতিতে ঈদ অতিমাত্রায় ব্যক্তিগত উৎসব এবং সে কারণে ঈদ উদযাপন অনেকটাই নীরবে হয়। বেশির ভাগ ইরানি ঈদুল ফিতরকে আইদি ফিতর বলে। ইরানে প্রত্যেক মসজিদে বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ঈদের দিনে তিউনিসিয়ানরা একে অন্যকে বিস্কুট উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়ান পুরুষরা তাদের ঈদ উদযাপন শুরু করেন। আর এ সময় মহিলারা ব্যস্ত থাকেন মুখরোচক খাবার প্রস্তুতির কাজে। ঈদ উপলক্ষে শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে নতুন জামা এবং খেলনা উপহার পেয়ে থাকে। অন্যদিকে সৌদি আরবে ঈদের উৎসব শুরু হয় খুব ঘটা করে। সেখানে বিভিন্ন গোত্র বিদ্যমান। এক এক গোত্রের ঈদ আয়োজনে যেমন ভিন্নতা আছে, তেমনি আছে অনেক রকম মিল। ঈদের সময় সৌদিরা তাদের বাড়িটিকে খুব সুন্দর করে সাজান। এ সময় তারা তাদের সাদা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। ঈদের দিনে শিশুদের জন্য থাকে নানা ধরনের চমক। সবাই তাদের চকলেট উপহার দেন। এমনকি অনেক দোকানদারও শিশুদের ফ্রি চকলেট বিতরণ করেন।বর্তমান প্রেক্ষিতে ঈদ উদযাপনে মাঝে মধ্যে উগ্রবাদি গোষ্ঠীর হুমকি হামলা স্বত্ত্বেও মানুষজনের মধ্যে উদযাপনের কোন ঘাটতি দেখা যায় না। তাছাড়া পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশিদের মধ্যে আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার বন্ধন তৈরি হয় যা পরবর্তীতে বছর জুড়ে থেকে যায় লোকজনের মধ্যে। হীনমন্যতার লেশ রোধ করে পরিপক্ক হওয়ার মৌনতায় নিজের পরিণত করার চেষ্টায় ঐক্যবদ্ধ থাকেন সবাই।  সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দবোধের ভিত্তিতে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও মূল্যবোধ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি সেলামির প্রচলন ঈদ উৎসবকে ভিন্নমাত্রা প্রদান করে থাকে। ছোটরা বড়দের নিকট থেকে ঈদের দিন তাদের নিজস্ব পাওনা আদায় করে নেয়। উৎসবমুখর পরিবেশে সামাজিক ভাতৃত্বের বন্ধনে শিশুরা বেড়ে উঠার সুযোগ পায়। সামাজিক শান্তি ও পারিবারিক বন্ধন রক্ষিত হয়।ঈদের আগমনকে ঘিরে অর্থনীতির গতিপথের চাঙ্গাভাবও প্রণিধানযোগ্য। সমাজের সর্বস্তরে ধনী গরিবের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আনা ঈদ আনন্দের লক্ষ্য হলেও অর্থনৈতিক সামঞ্জস্যহীনতার কারণে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তারপরেও এই ঈদের জন্য পুরো ১ বছর অপেক্ষা করে থাকে লাখ লাখ মানুষ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী সকলেই ঈদের আমেজের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।ঈদুল আজহার বিশেষত্ব আসে কুরবানির মাধ্যমে। সামর্থবানগণ নিজেদের সাধ্যনুযায়ী পশু কুরবানি দিয়ে থাকে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য। কুরবানির গোশত বন্টনের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়ে থাকে। গরিব এবং নিচু পর্যায়ের লোকজন ধনীদের প্রদানকৃত গোশতের মাধ্যমে নিজেদের ঈদানন্দে পরিপূর্ণতা আনয়ন করে থাকে। তাছাড়া ঈদুল আজহায় দরিদ্রদের যাকাত দিয়ে থাকেন ধনী তথা সামর্থবান লোকেরা।তাছাড়া ঈদুল আজহায় চামড়া শিল্পের বিকাশ ঘটে থাকে এবং এ শিল্পে বহুমানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়ে থাকে। সুতরাং ঈদুল আজহার সার্বিক গুরুত্ব অপরিসীম।রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক উৎসব হিসেবে ঈদের গুরুত্ব অপরিসীম। সারাবছর ব্যাপী রাজনৈতিক নেতারা পারস্পারিক বিষোদাগার করলেও ঈদের সময়ে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন।শুধু কি দেশেই আন্তর্জাতিক ভাবে ঈদের সময়ও বিশ্ব নেতারা পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন, মুসলিম উম্মাহর প্রতি বিশ্বনেতারা বার্তা প্রদান করে থাকেন সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রত্যাশায়।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ