September 24, 2017

জাতির জন্য দুর্ভাগ্য

FB_IMG_1484231984692রায়হান আহমেদ তপাদার : ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে বন্যাকবলিত এলাকা গুলোতে।বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও স্থানীয়দের অভিযোগ জনপ্রতিনিধিদের স্বজন, সরকারি দলের লোকজনকে ত্রাণ সুবিধা দেয়া হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নন এমন ব্যক্তি ও সচ্ছল ব্যক্তিরাও দলীয় পরিচয়ে ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন। এলাকায় থাকেন না এমন ব্যক্তির নামেও ত্রাণ বরাদ্দের প্রমাণ পাওয়া গেছে।তাছাড়া ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা এবং ভোট রাজনীতির অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। তাছাড়া ত্রাণ পাওয়া ও না পাওয়াদের মধ্যে গড়ের বাজারে মারামারির ঘটনাও ঘটে উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।সারা দেশজুড়ে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।এদিকে বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ত্রাণের বরাদ্দের তেমন কমতি নেই। ত্রাণ বিতরণও করা হচ্ছে। কিন্তু ত্রাণ জুটছে না সকলের। অভিযোগ উঠেছে, ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে। সাধারণত জেলা প্রশাসন থেকে উপজেলা হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ত্রান বিতরণ করা হচ্ছে।আরেক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি ভাবে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় নিতান্তই স্বল্প। বিশেষ করে চাল সংকটের কারণে বন্যার্তদের মাঝে চালের বদলে গম দেয়া হচ্ছে। আর এই গমের জন্যও সরকারিভাবে বন্যাকবলিত মানুষের যে তালিকা করা হয়েছে সে তালিকায় অনেক বানভাসি মানুষের ঠাঁই হয়নি। এর ফলে বানভাসি আক্রান্ত মানুষ ত্রাণের জন্য আর্তনাদ করে যাচ্ছেন। পানিবন্দি মানুষ ত্রাণ সংগ্রহ বা খাবার সংগ্রহ করতেও মারাত্মক কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।  জানা গেছে,বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা দেখা গেলেও অসহায় মানুষের খাবারের কষ্ট খুব একটা লাঘব হচ্ছে না। হাকালুকি পাড়ে এবারের বন্যায় অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা এখনো সম্ভব হয়নি। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সরকারিভাবে যে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে তা থেকে বিপুল-সংখ্যক বন্যার্ত মানুষ বাদ পড়েছেন।তাছাড়া বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়,মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বানভাসিদের কেউ ত্রাণ পেয়েছেন আর কেউ ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছেন।বাস্তবে অধিকাংশ বানভাসি ত্রাণের দেখা পাচ্ছেন না। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারি ত্রাণ নিয়ে শুরু হয়েছে তেলেসমাতি।এই তেলেসমাতিতে পড়ে প্রকৃত বানভাসিরা ত্রাণের দেখা পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানের কারসাজি এবং গ্রুপিং রাজনীতি’র কারণে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। তারা বলেন, মেম্বার কিংবা চেয়ারম্যানরা শুধু তাদের নিজেদের অনুসারী বানভাসি মানুষকে ত্রাণ দিচ্ছেন। নিজেদের বলয়ের বাইরের মানুষের ত্রাণ দিতে তারা রাজি নন। এর ফলে প্রকৃত বানভাসিরা ত্রাণ পাচ্ছেন না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন ত্রাণ দেয়ার জন্য তালিকা করতে গিয়ে তারা শুধু নিজের অনুসারীদেরই নাম উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় ভোটের স্বার্থে তালিকা তৈরির সময় বানভাসিদের নিয়ে এই স্বজনপ্রীতি তারা করেছেন। এই স্বজনপ্রীতির ফলে চেয়ারম্যান ভোটের সময় তাদের লাভ হলেও প্রকৃত বানভাসি দলীয় সম্পাদকের দেয়া ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর তালিকাকারীদের এ ধূর্ততা দলীয় সম্পাদক জানতেও পারেননি।  দেশের বিভিন্ন স্থানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিরা বলেছেন,প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা কিন্তু ঐ এলাকার চেয়ারম্যান ৫ কেজি করে চাল দিয়েছেন। এতে তো বেশি মানুষ চাল পেয়েছেন, তাতে ক্ষতি কী-এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি বলেন,হ্যাঁ বেশি মানুষ ত্রাণ পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে নাকি দলীয় সম্পাদকের অনুমোদন ছিল না। তার মতে, দলীয় সম্পাদক ৯০০ জনকে ১০ কেজি করে ত্রাণ দিতে পারলে আরো ৫০ জনকে ১০ কেজি করে দিতে পারতেন। এখানে ঐ ব্যক্তি ত্রাণ নিয়ে অসততার পরিচয় দিয়েছেন। এটা কোনোমতেই কাম্য হতে পারে না।অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেম্বার-চেয়ারম্যানরা যখন ত্রাণ দেয়ার জন্য বানভাসিদের তালিকা করেন তখনই মূলত দুর্নীতি হয়। তালিকায় কিভাবে দুর্নীতি হয় জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুড়ীর এক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, প্রত্যেক চেয়ারম্যান যে রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত হন সেই চেয়ারম্যান শুধু তার অনুসারীদেরই ত্রাণ দেন। প্রকৃত বানভাসি যদি ওই চেয়ারম্যানের অনুসারী না হন তাহলে ওই বানভাসি কোনোভাবেই ত্রাণ পাবেন না। আর চেয়ারম্যান তালিকা না দিলে স্থানীয় প্রশাসনও প্রকৃত বানভাসির তালিকা করতে পারে না। এমন খপ্পরে পড়ে অধিকাংশ বানভাসি ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর মেম্বাররা কিভাবে ত্রাণের তালিকা নিয়ে দুর্নীতি করেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওই চেয়ারম্যান বলেন, মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর ওই মেম্বার হিসাব করে বের করেন কোনো কোনো গ্রামের ভোটাররা তাকে ভোট দেয়নি। ওই হিসাব বের করার পর নির্বাচিত মেম্বার যে গ্রামের লোকজন ভোট দেন না সেই গ্রামের মানুষের সরকারি কোনো সাহায্য দেন না। এর ফলে নির্বাচিত মেম্বারের অনুসারী না হলে কোনো সাহায্য পান না দুর্গতরা।এর চাইতে কলঙ্ক আর কি হতে পারে।  অন্যদিকে চেয়ারম্যান যদি বিরোধী দলের রাজনীতিক হন তাহলে তার বরাদ্দে আসা ত্রাণের একটি বড় অংশ সরকারদলীয় রাজনীতিকদের ঘুষ দিতে হয়। এ ঘুষনা দিলে বিরোধী রাজনীতিক সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে বিপদে পড়তে হয়। এ বিপদ এড়াতে বিরোধী রাজনীতিক চেয়ারম্যান ত্রাণের বড় অংশ সরকারি দলের স্থানীয় রাজনীতিকদের হাতে তুলে দেন। এর পরে আর দুর্গতদের হাতে তুলে দেয়ার মতো কিছু থাকে না।এ ছাড়া উপজেলা-জেলাজুড়ে রয়েছে গ্রুপিং রাজনীতি। গ্রুপের রাজনীতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে মেম্বার-চেয়ারম্যানরা গ্রুপের পছন্দমতো লোকদের ত্রাণ দেন। এতে অধিকাংশ বানভাসি ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হন। আরেক খবরে জানা যায়, সুনামগঞ্জের দেড় লাখ ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও হতদরিদ্র চাষীর জন্য বিশেষ ভিজিএফ নিয়ে তেলেসমাতি কান্ড কারখানা শুরু হয়েছে। জেলাজুড়ে বিভিন্ন খাতের সরকারি বরাদ্দের চাল নিয়ে শুরু হয়েছে চালবাজি। এখন বিশেষ ভিজিএফ নিয়েও শুরু হয়েছে তেলেসমাতি কান্ড  জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ ভিজিএফ’র চাল প্রথম কিস্তির ৩৮ কেজির বদলে দেওয়া হয়েছে ৩২ কেজি। বিভিন্ন স্থানে নাম তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে টাকা নিয়েছেন কিছু চেয়ারম্যান-মেম্বার। সুবিধা নিয়ে একই পরিবারে স্বামী, স্ত্রী, পিতা-পুত্র, ভাইসহ একাধিকজনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন লন্ডনি পরিবারের লোকজনও। আগামীতে ত্রাণ দেয়া হবে না এই ভয়ে ওজনে কম দেওয়া সত্ত্বেও মেনে নিয়েছে গ্রামের সহজ-সরল কৃষকেরা।আবার অনেক এলাকায় মৃত ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান যায়।এমনকি এক ইউপি সদস্য তার তিন সন্তানসহ আপন ভাইয়ের দুই মাস বয়সী সন্তানকেও তালিকাভুক্ত করে বরাদ্দ তুলে নিয়েছেন।জানা গেছে,শুরুতেই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বদলে পুরনো কৃষিকার্ড ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা ধরে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তালিকা করেন।  আবার কোথাও কোথাও দলীয় নেতারাও তালিকা তৈরিতে যুক্ত ছিলেন। অনেক স্থানে তালিকায় নাম ওঠাতে প্রকাশ্যে টাকাও নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বদলে চাষের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান এমন লোকদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অনেক স্থানে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও হতরিদ্র চাষী হিসেবে এই ভিজিএফ সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও তাদের বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তাদের একাধিক আত্মীয়ের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন।অপরদিকে হাওরের কৃষকদের বিশেষ ভিজিএফ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের সদস্যরা। এই ইউনিয়নে একই পরিবারে, পিতা-পুত্র-ভাই, স্বামী-স্ত্রীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের সবাই লন্ডনে অবস্থান করছে এমন ধনাঢ্য পরিবারও রয়েছেন বিশেষ ভিজিএফ তালিকায়। তালিকায় নাম থাকার পরও একাধিকজনকে ত্রাণ দেওয়া হয়নি। ত্রাণ চাইতে গিয়ে তাদের মারধর করা হয়েছে। একই ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে একাধিকবার এমন ঘটনাও রয়েছে।এভাবে শুধু জগন্নাথপুর উপজেলার ওই ইউনিয়নই নয়, জেলার অনেক ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা সুবিধা নিয়ে তালিকা তৈরিতে নয়ছয় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম কখনোই কাম্য নয়। এসব অনিয়ম বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।সরকার যার হাতেই বিশ্বাস করে কিছু দেয় গরীবদের মাঝে বিতরণ করতে তা নিজে খেয়ে ফেলতে চায়। তা ডাক্তার, সরকারি অফিসার অথবা দলীয় লোক।এটাই জাতির জন্য দুর্ভাগ্য।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ