September 19, 2017

জুড়ী-বড়লেখায় ২৫ সহস্রাধিক মানুষের পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস

Moulvibazar Pic-1 16,06,2017বিশেষ প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার প্রায় কয়েক হাজার মানুষ পাহাড়ের চুড়া আর টিলার পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বেশিরভাগ সরকারী খাস জমিতে এসব বসতি গড়ে উঠলেও ভুমি প্রশাসন ছিলো নির্বিকার। ফলে প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে টিলা ধসে দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ৩ বছরে টিলা কাটতে গিয়ে মাটি চাপায় ও টিলা ধসে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান  বিভিন্ন এলাকার ঘটনার খবরে বুধবার সকালে জুড়ী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অতি বৃষ্টির কারনে পাহাড় ধসে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হতে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জনসচেতনা মূলক মাইকিং করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের লোকজন সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন।
পাহাড়ি এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পাহাড়ের চুড়া ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারীদের অধিকাংশই ভুমিহীন, হতদরিদ্রর ও অসহায় প্রকৃতির। মাথা গুজার বিকল্প স্থান না থাকায় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এরা বৈধ-অবৈধ পথে সরকারী টিলা দখল করে বসবাস শুরু করে। জীবিকার তাগিদে এরা বৃক্ষ নিধন, টিলার মাটি ও পাথর বিক্রির মত পরিবেশ বিধংসী কাজে জড়িয়ে পড়ে। বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার স্থানীয়দের দেয়া তথ্যানুযায়ী পাহাড়ের চুড়া ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। প্রভাবশালী মহল প্রতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে টিলা কেটে লাখ লাখ টাকার মাটি বিক্রি করছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে টানা ভারী বর্ষন হলেই আগের কাটা পাহাড়ের অবশিষ্ট অংশ ধসে পড়ে। আর এসময় পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীরা দূর্ঘটনা কবলিত হন।
ভৌগলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে পাথারিয়া পাহাড় ও হাকালুকি হাওর বেষ্টিত এ দুই উপজেলায় এরকম Moulvibazar Pic-2 16,06,2017র্দর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের যে ভূমিকা থাকার কথা সে রকম ভূমিকা নেয়া হচ্ছেনা বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। কোন অঘটন ঘটলেই দৌড় ঝাঁপ শুরু হয়। ইতিপুর্বে বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের বোবারতল এলাকায় ঘটে যাওয়ায় এমন দু’টি ঘটনা এর প্রমান। দূর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন দূর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়দের সচেতন করতে কিছুটা তৎপর হতে দেখা গেলেও তা আশানুরুপ নয় বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর। এই ২টি উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ প্রতিবছরই পাহাড়ে বসবাসকারীরা আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে অবাধে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করে। তারা সরকারী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাহাড়ী টিলা কেটে চূড়া ও পাদদেশে নির্মাণ করেন ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর। তাদের এমন আচরনে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ী বনবৃক্ষ ও জঙ্গল। এমন নির্মমতায় বাসস্থান হারাচ্ছে বন্য প্রাণী। হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ী টিলা বেষ্টিত এ অঞ্চলের পরিবেশ।
সরেজমিনে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ী টিলা কেটে মাটি বিক্রি করায় পাদদেশের বসতবাড়ীগুলো অত্যন্ত ঝুকিতে থাকতে দেখা গেছে। জুড়ী ভজিটিলা নামক একটি বিশাল টিলা শুস্ক মৌসুমে কেটে ফেলায় নিচের প্রায় ২০০ পরিবারের সহ¯্রাধিক নারী-পুরুষ মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। আর বড়লেখার দুর্গম বোবারথল, ডিমাই, তেরাদরম, কাশেমনগর, বিওসি কেছরিগুল এলাকায় পাহাড়ী চুড়ায় ও টিলার পাদদেশে এদের অবস্থন সবচেয়ে বেশী ঝুকিপুর্ন। বসতবাড়িগুলোতে দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া, জুলেখা বেগম, রুবেল আহমদ, পারভিন বেগম, ডেইজি বেগম, আব্দুস সহিদ প্রমূখ জানান, শুস্ক মওসুমে অবাধে এসকল এলাকায় পাহাড় কাটা চলে। বর্ষায় কিছুটা কম হলেও থেমে থাকে না পাথর খেকো চক্র।
গত কয়েক দিনের মুষলধারে বৃষ্টির কারনে বড়লেখার দুর্গম বোবারথল, ডিমাই, তেরাদরম, কাশেমনগর, বিওসি কেছরিগুল এলাকায় পাহাড়ী চুড়ায় ও টিলার পাদদেশে নির্মিত বসত ঘরের আশ পাশের মাটি ধসে গেছে। যেকোন সময় প্রাণহানীসহ বড় ধরনের দূর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। ইতিপুর্বে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আব্দুল হাসিবের বসতঘর মাটি চাপা পড়লেও অলৌকিভাবে পরিবারের ৬ সদস্য বেঁচে যায়। এর কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় আরেক ব্যক্তি পাহাড় চাপায় প্রাণ হারান। এর আগের বছর শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। স্থানীয় সুত্রে জানা যায় বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় ইতিপুর্বে অবৈধভাবে টিলার মাটি কাটতে ও পাহাড় ধসে অন্তত: ২০-২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনায় পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা প্রশাসন গত ১৪ জুন সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং করেছে। দুই উপজেলার উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, থানার ওসি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা ঝুকিপুর্ণ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু চৌধুরী এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান এবং জুড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গুলশান আরা মিলি জানান, পাহাড়-টিলা ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে এমন জনবসতি এলাকায় তারা পরিদর্শন করেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে পাহাড়-টিলায় বসবাস না করতে এলাকায় গণসচেতনতা মুলক মাইকিং করতে বলা হয়েছে।

সর্বশেষ সংবাদ